নারকো – সন্ত্রাসী আরাকান আর্মির বিলিয়ন ডলারের মাদক সাম্রাজ্য; আয়ের সিংহভাগ আসে বাংলাদেশ থেকে।

0

নারকো – সন্ত্রাসী আরাকান আর্মির বিলিয়ন ডলারের মাদক সাম্রাজ্য; আয়ের সিংহভাগ আসে বাংলাদেশ থেকে। 

নারকো-সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি (AA) এখন আর কেবল কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়; তারা পরিণত হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ‘নারকো-সন্ত্রাসী’ সাম্রাজ্যে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক মাদক পাচার থেকে তাদের বার্ষিক আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আর এই বিশাল অর্থের সিংহভাগই আসছে বাংলাদেশ থেকে, যেখানে প্রতিদিন পাচার হয়ে আসা কোটি কোটি ইয়াবা ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের তরুণ প্রজন্মকে।

থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। বর্তমানে এই প্রাণঘাতী মাদক বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণের সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ গ্রাস করছে যা দেশের অসংখ্য পরিবারের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

> বাংলাদেশ: আরাকান আর্মির মূল টার্গেট

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ রেকর্ড ৯০.৫৮ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিসে পৌঁছেছে।

সম্প্রতি টেকনাফের হ্নীলায় বিজিবি ও নৌবাহিনীর একটি বিশেষ অভিযানে ২৫ কোটি টাকা মূল্যের ৫ লাখ পিস ইয়াবাসহ একটি বিশাল চালান জব্দ করা হয়। এই অভিযান প্রমাণ করে যে, বাজারে প্রতি পিস ইয়াবা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশই তরুণ। শুধু ২০২৫ সালেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জব্দ হয়েছে ১৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি ইয়াবা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দ হওয়া এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা আসলে মোট পাচারের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

> পাচারের নতুন রুট ও আধুনিক কৌশল

শান ও চিন রাজ্যের গোপন ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত ইয়াবা বাংলাদেশে পাঠাতে নারকো-সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি অন্তত ১৭টি ভিন্ন রুট ব্যবহার করছে। স্থলপথে নজরদারি জোরদার হওয়ায় পাচারের কৌশলও বদলেছে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ মাদক টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও কুয়াকাটার সমুদ্রপথ দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে।

কক্সবাজারের পালংখালীসহ নাফ নদী সংলগ্ন সীমান্তে বিজিবির দুটি চেকপোস্টের মাঝখানে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মিটারের একটি ফাঁকা জায়গা রয়েছে। দুর্গম কেওড়াবনের এই ভৌগোলিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা বিজিবির শিফট পরিবর্তনের সময়, প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি কিংবা সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সীমান্ত পার হয়।

শুধু তাই নয়, টেকনাফ-উখিয়া এলাকায় মাদক আরাকান আর্মির মাদক পাচারকারীরা এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বিজিবির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে তারা অ্যাডভান্স ড্রোন ব্যবহার করছে, যা প্রতি উড্ডয়নে ১০ থেকে ২০ হাজার ইয়াবা বড়ি সীমান্ত পার করতে সক্ষম।

এর পাশাপাশি, সীমান্ত জুড়ে চলছে দ্বিমুখী চোরাচালান। বাংলাদেশের ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার নাফ নদী, পার্শ্ববর্তী খাল ও চিংড়ি খামারের মাধ্যম মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় একটি সম্পূর্ণ নারী সিন্ডিকেটসহ আরাকান আর্মির একাধিক নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি জব্দ হওয়া চালানগুলো মোট পাচারের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ মাদকই নজরদারি এড়িয়ে বাজারে চলে যায়।


সেপ্টেম্বর ২০২৫: যৌথ অভিযানে ৩,৪৩৮ কেজি ক্রিস্টাল মেথ ও ২,১৯৮ কেজি কেটামিন জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৯৫.৮৫ বিলিয়ন ক্যাত (৯৪ মিলিয়ন ডলার)।


নভেম্বর ২০২৫ (৫-১৬ তারিখ): অভিযানে আরও ৪,০০০ কেজি আইস (৫৭.২ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের) জব্দ করা হয় এবং ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।


জুন ২০২৫: ইয়াঙ্গুন-আরাকান রুটে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৮৫ হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়, যার চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ।


২০২০-২০২৫: আরাকান আর্মির এমন ৯টি বড় চালানের সন্ধান পাওয়া যায়, যার মোট আর্থিক মূল্য ছিল ১৪০.৫ মিলিয়ন ডলার। ভাবা যায় ধরা পরা সামান্য অংশই কত টাকার !


> অর্থ দিয়ে অস্ত্র কেনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা

মাদক থেকে অর্জিত এই বিপুল অর্থ দিয়ে নারকো-সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করছে। এই অর্থ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চীন ও ইউপিডিএফ-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

একই সাথে মজলুম রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর এসব দিয়ে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে এই সন্ত্রাসী বাহিনী।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে এই বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাময় কেন্দ্রগুলোর দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. আরিফুজ্জামান বলেন:

“আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।”

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, পুরো বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র ৩৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। ফলে চিকিৎসা ও মানসিক সেবা প্রয়োজন এমন ৯০ শতাংশ মানুষই প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না।


> সময়ের দাবি: ‘জিরো টলারেন্স’

সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির মতে, স্থানীয় জনগণের সরাসরি সহযোগিতা ও সচেতনতা ছাড়া আরাকান আর্মির এই সুসংগঠিত চোরাচালান নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া কঠিন।

দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে এখন কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। সীমান্ত ও সমুদ্রপথে সর্বোচ্চ নজরদারি জোরদার করা এবং আরাকান আর্মিকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করা সময়ের দাবি।


এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘নারকো-সন্ত্রাস’ পুরো জাতিকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে, যেখানে আমার আপনার সন্তানের জীবন বিপন্ন হবে আর ভোগ-বিলাস করবে নারকো-সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি !

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team