পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি কমিশনের পুনর্গঠন ও ডিজিটাল জরিপ এখন সময়ের দাবি

0

 পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি কমিশনের পুনর্গঠন ও ডিজিটাল জরিপ এখন সময়ের দাবি

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে উপজাতি-বাঙালি বিরোধ ও আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে অসংখ্য পার্বত্যবাসীর প্রাণ গেছে, যা সংখ্যার বিচারে কয়েক হাজার।

অজ্ঞতাপ্রসূত অথবা পক্ষপাতদুষ্ট অনেকেই এই বিরোধের জন্য ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া, আশির দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের পুনর্বাসন বা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হওয়া আদিবাসী স্বীকৃতি না দেওয়াকে দায়ী করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যার মূলে রয়েছে ভূমি বিরোধ, আর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমেই সম্ভব সব বিরোধের অবসান। অতীত ঘাঁটলে দেখা যায় যে ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়ালে স্পষ্ট লেখা ছিল উপজাতীয়রা ২৫ বিঘা জমি ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু জমির মালিক হতে পারবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিনিধি লর্ড কর্নওয়ালিশ কর্তৃক ভারত উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা কার্যকর থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন উপজাতীয় প্রধানকে জমিদারি স্বত্ব দেওয়া হয়নি।

শুধু সার্কেল চিফ বা রাজা খেতাব দিয়ে তাঁদের খুশি রাখা হয়েছিল। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে ভূমিসংক্রান্ত যেকোনো ক্রয়-বিক্রয়, পরিবর্তন বা অধিগ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক এটি চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়েছে, যা বর্তমানে মহামান্য হাইকোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ও পিসিজেএসএসের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ (২০০১ সালের ৫৩ নম্বর আইন) প্রণয়ন করা হয়।

উল্লিখিত আইনের অধীনে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়—১.বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি (কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন)। ২. আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তাঁর প্রতিনিধি। ৩. সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পদাধিকারবলে। ৪. সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ বা তাঁর মনোনীত একজন প্রতিনিধি। ৫. চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার বা তাঁর মনোনীত অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর ব্যাপারে আপত্তি তুলে সংশোধনের দাবি জানায়। তারা তাদের দাবির পক্ষে সরকারের পাস করা আইনের ২০টি ধারার বিপরীতে আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে প্রথমে ১৯ দফা সুপারিশ প্রেরণ করে। পরবর্তী সময়ে সুপারিশ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩। ২০১২ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সভা ভূমি কমিশন আইনের ১৩টি সংশোধনী পাসের জন্য অনুমোদন দিয়েছিল, কিন্তু সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে তা কার্যকর করা যায়নি। এরপর ২০১৩ সালের ২৭ মে মন্ত্রিপরিষদ সভা ভূমি কমিশন আইনে আগের গৃহীত ১৩টি থেকে কমিয়ে ছয়টি সংশোধনী গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, যা সংসদের মাধ্যমে পাস করার কথা ছিল। কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি। এরপর বেশ কিছুদিন নীরব থেকে হঠাৎ করেই ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করে মন্ত্রিপরিষদ। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে আগে যেসব সংশোধনী দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কার্যকর করা যায়নি, কোন বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে সেসব সংশোধনী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে মান উত্তীর্ণ হয়ে গেল?

২০০১ সালের আইনে কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিশনের চেয়ারম্যানকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা রায় প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া ছিল। তবে ২০১৬ সালে ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ সংশোধিত হলে চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রহিত করা হয়। সংশোধনী অনুযায়ী আগের ‘চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে’ বিধান পরিবর্তন করে ‘চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে’ নিধারণ করা হয়। কমিশনের পাঁচজন সদস্যের মধ্যে ন্যূনতম তিনজন (ক্রমিক ২, ৩ ও ৪) স্বাভাবিকভাবেই উপজাতি সম্প্রদায়ের। সংশোধিত আইনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে বিধায় উপজাতি বিচার প্রার্থীরাই তুলনামূলকভাবে অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন বলে অনুমেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি বাঙালি। তা সত্ত্বেও কমিশনে বাঙালি কোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে জরিপ হবে, নাকি বিরোধপূর্ণ জমি চিহ্নিত ও যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই জরিপ পরিচালিত হবে? বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়, এর সঙ্গে ভূমির ঐতিহাসিক রেকর্ড, দখল, বন্দোবস্ত ও শান্তিচুক্তির ব্যাখ্যার প্রশ্নও জড়িত। কমিশন পুনর্গঠনের প্রয়োজন কেন দেখা দেয়? এ ধরনের ভারসাম্যহীন একটি কমিশনের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত সর্বজনগ্রাহ্য হবে না।

ব্রিটিশ প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের কথা বলে পাহাড়ের সমগ্র ভূমি উপজাতীয়রা নিজেদের দাবি করে আসছে। শাসনবিধি মোতাবেক ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য শতভাগ উপজাতীয় হেডম্যান ও সার্কেল চিফ নিয়োগ এবং ভূমি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পার্বত্য জেলা পরিষদকে, যা দেশের প্রচলিত ভূমি আইন পরিপন্থী। সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত। এতে আঞ্চলিক শাসন ব্যবস্থার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯(১) অনুসারে রাষ্ট্রের সব নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। অনুচ্ছেদ ২৭ অনুসারে রাষ্ট্রের সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান অধিকার লাভকারী।

১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঘ খণ্ডের ধারা ৪, ৫ ও ৬-এ একটি ভূমি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার ক্ষমতাবলে ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (৫৩ নম্বর আইন) প্রণয়ন করা হয়; যেখানে বলা আছে, কমিশনের কার্যাবলি হবে, যথা—১. পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা। ২. আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী, বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের, স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল; অর্থাৎ দেশের প্রচলিত ভূমি আইন নয়, বরং উপজাতি প্রথাগত রীতি পদ্ধতিতে।

২০১৬ সালের সংশোধনী (৪৫ নম্বর আইন) এটিকে শক্তিশালী করেছে। ফলে ১৯৭৯ সালে সরকার পুনর্বাসিত বাঙালিদের ভূমি নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। জেলা প্রশাসকের দেওয়া খাসভূমির বন্দোবস্ত বা কবুলিয়তও প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে বলে বাতিলযোগ্য হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর আইন হচ্ছে ১৬। ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৭। (১) অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন কমিশনের সিদ্ধান্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি বা ক্ষেত্রমত আদেশের ন্যায় কমিশন উহার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে বা প্রয়োজনবোধে সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করিতে বা করাইতে পারিবে। (২) উপধারা (১)-এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সকল কর্তৃপক্ষ কমিশনের নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকিবে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বাসিন্দাদের প্রায় সাড়ে ২২ হাজার আবেদন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে পড়ে আছে। কারও আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি যথার্থ আইন না থাকায়। চুক্তির (খ) খণ্ডের ২৪ নম্বর ধারার (ক) অংশে বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না। (খ) আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না। (গ) পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবে।

অধ্যাদেশ ২০১৬ ধারা ৬(১)(ক)-এর মাধ্যমে সরকার কার্যত আগে দেওয়া সব বন্দোবস্তকে অবৈধ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। অন্যদিকে অবৈধ বন্দোবস্ত এবং অন্যান্য ভূমি বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে, যা মূলত হেডম্যান, কার্বারি ও সার্কেল চিফদের ব্যক্তিগত মতামত ও সিদ্ধান্তকে বোঝানো হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে হেডম্যান, কার্বারি কিংবা সার্কেল চিফ একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। তাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ মতামত প্রত্যাশা করা অবাস্তব এবং ইচ্ছা করলেও তাদের পক্ষে স্বাধীন মতামত দেওয়া সম্ভব নয়।

ধারা ৬(১)(গ) এই ধারাটি সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৪২-এর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। ভূমি কমিশন আইনে ওই ধারা সংযোজনের মাধ্যমে ভূমিতে স্থানীয় বাঙালিদের অর্জিত দলিলগুলোর আইনি ও বৈধ মূল্য সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে। এর প্রভাব হতে পারে—১. পার্বত্য জেলাগুলোতে সরকারি স্থাপনা, সেনানিবাস ও সেনা স্থাপনা সম্পর্কীয় ভূমি, যা মূলত সরকারের নামে রেকর্ডকৃত, সেসব ভূমিসংক্রান্ত আপত্তি কমিশনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ওই সব এলাকায় সেনানিবাসের ভূমিসংক্রান্ত আইনি জটিলতা উদ্ভবের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ২. ধারাটি সংশোধনের ফলে জলে ভাসা জমি, বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদে ভেসে ওঠা জমিসহ অন্যান্য জমির ওপর একতরফাভাবে উপজাতিদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই জমিতে কোনো বাঙালি বন্দোবস্ত পেয়ে থাকলেও তা থেকে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে উচ্ছেদ করতেই আইনে এই সংশোধনী আনা হয়েছে। অথচ বন্দোবস্ত, লিজ, কবুলিয়ত ইত্যাদি আইনি পরিভাষায় শুধু খাসজমি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং খাসজমির মালিক হচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে নাগরিক বা সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩০ ভাগ ভূমিতে অবস্থিত রিজার্ভ ফরেস্ট, সরকারি শিল্প-কারখানা, সেনানিবাস, বিজিবি, পুলিশ ব্যারাক, ডিসি অফিস, এসপি অফিস, ভূমি অফিস, আদালতসহ সব ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত অবৈধ বলে প্রমাণিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির সঠিক মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাধা হলো একটি নির্ভুল এবং বৈজ্ঞানিক ভূমি জরিপের চরম অভাব। প্রথাগত ব্যবস্থা ও আনুমানিক সীমানার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘদিন ধরে ভূমি বিরোধ চলে আসছে, যার ফলে ভুয়া রেকর্ড ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি দখলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইনে যদিও পরিষ্কার বলা আছে যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, রাষ্ট্রীয় শিল্প-কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত জমি হস্তান্তরে জেলা পরিষদের কোনো অনুমতি লাগবে না, কিন্তু বাস্তবে এসব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পত্তির সঠিক ভূ-জরিপ না থাকায় আইনি সীমানা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানকল্পে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ম্যাপ এবং জিআইএস পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ চালানো অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক পদ্ধতিতে জরিপ সম্পন্ন করে প্রতিটি প্লটের ডিজিটাল ডেটা বেইস ও অনলাইন ভূমি রেকর্ডরুম স্থাপন করতে হবে। পার্বত্য এলাকার প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা (যেমন—জুম চাষ বা সার্কেল চিফের প্রথা) এবং দেশের প্রচলিত সাধারণ ভূমি আইনের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা এখন সময়ের বাধ্যবাধকতা। প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা গেলে একদিকে যেমন ভুয়া মালিকানার দাবি বাতিল হয়ে যাবে, অন্যদিকে ভূমি কমিশনের বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বেশি নির্ভুল ও দ্রুত হবে। ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই শুধু অবৈধ দখল ঠেকানো এবং জাতীয় সম্পত্তির ওপর রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৫০.০৬ শতাংশই বাঙালি। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও ভারসাম্য ফেরাতে হলে বিতর্কিত ভূমি কমিশন আইন অবিলম্বে সংশোধন ও কমিশন পুনর্গঠন করে এতে বাঙালিদের আনুপাতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, জেলা পরিষদের একচ্ছত্র ও অসাংবিধানিক ক্ষমতা সংশোধন করা এবং জরুরি ভিত্তিতে সরকারের নামে নিবন্ধিত ও সংরক্ষিত সব ভূমির আধুনিক সার্ভে সম্পন্ন করে বৈধ কাগজপত্রধারীদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি সুনির্দিষ্ট করা।
- এম আই মামুন

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team