শেকড়ের গল্প, আলোর অপেক্ষা: তারেক রহমান

0

শেকড়ের গল্প, আলোর অপেক্ষা: তারেক রহমান

কিছু মানুষের জীবন সরলরেখায় চলে না। বরং অনেকটা নদীর মতো — পাথর ঠেলে, বাঁক পেরিয়ে, মাঝেমধ্যে ভাঙনের মুখোমুখি হয়েও নিজের গতিপথ খুঁজে নেয়। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনটাও অনেকটা তেমন একটা নদীর গল্প।

শেকড়ের সন্ধানে

আশির দশকের শেষভাগে, যখন দেশে সামরিক শাসনের ছায়া কাটিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লড়াই চলছিল, তখনই তরুণ তারেক রহমান রাজনীতিতে পা রাখেন। বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া চিন্তা — জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল আস্থা — তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত গড়ে দেয়। আর বাবার আকস্মিক প্রয়াণের পর মা বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে সাহস নিয়ে দলের হাল ধরেছিলেন, সেই দৃঢ়তাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে তাঁর নেতৃত্বের নিজস্ব ভাষা স্পষ্ট হতে থাকে। তিনি তরুণদের রাজনীতিতে টেনে আনার নতুন ধারা তৈরি করেন, জেলা-উপজেলা ঘুরে দলকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল — রাজনীতির আসল উৎস ড্রয়িংরুম নয়, গ্রাম আর তৃণমূলের মানুষ।

ঝড়ের বছরগুলো

কিন্তু এই পথ ফুলে ঢাকা ছিল না। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ঘিরে শুরু হয় একের পর এক মামলা আর অভিযোগ। রিমান্ডের নামে শারীরিক নির্যাতনের কথাও শোনা যায়, যার রেশ তিনি আজও বহন করেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা বলেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তাঁকে কাটাতে হয় লন্ডনে, দেশ থেকে দূরে। তবু এই দূরত্ব তাঁকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি — সামাজিক মাধ্যম আর ভার্চুয়াল সভার মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত দলের নেতাকর্মী আর দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গেছেন। যাঁরা ভেবেছিলেন দূরত্ব একদিন তাঁকে বিস্মৃত করে দেবে, তাঁরা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন — শেকড় যত গভীরে প্রোথিত থাকে, ঝড় তাকে তত দৃঢ় করে তোলে।

একটি বিড়াল, কিছু গাছ, আর নীরব দান

রাজনীতির কঠোর আলাপের বাইরেও তারেক রহমানের একটা কোমল পরিচয় আছে। তাঁর মেয়ে জাইমা রহমানের প্রিয় বিড়াল জেবু প্রায়ই তাঁর কোলে ঘুমিয়ে থাকে — পরিবারের কাছে এই ছোট্ট প্রাণীটা কেবল পোষ্য নয়, বরং অস্থির সময়ের মধ্যে একরকম প্রশান্তির প্রতীক। বড় গাছের প্রতি তাঁর যে টান, বগুড়ার একটা পুরনো গাছ কাটা পড়ার খবরে তাঁর মন খারাপ হওয়া, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাণির প্রতি মমতা শেখানোর স্বপ্ন দেখা — এসব ছোট ছোট গল্পই বলে দেয়, ক্ষমতার আলাপের আড়ালে একজন মানুষ আছেন যিনি নীরবে ঢাকার পশু আশ্রয়কেন্দ্রে সাহায্য পাঠান, অথচ কখনো তার প্রচার চান না।

স্বপ্নের নকশা

তারেক রহমানের রাজনৈতিক চিন্তায় বারবার ফিরে আসে একটাই সুর — ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না রেখে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য আর শস্যবীমার প্রস্তাব, উপজেলা পর্যায়ে হিমাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনা, তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং আর তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার স্বপ্ন, প্রতিটি ইউনিয়নে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার, আইন সভাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব — এই সবকিছুর কেন্দ্রে একটাই দর্শন: ঢাকা এগোলেই দেশ এগোয় না, দেশ এগোয় তখনই যখন প্রতিটা গ্রাম নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে।

ক্ষমতার নতুন ভাষা

আজ প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেও তাঁর আচরণে সেই একই সুর ধরা পড়ে। নিজের নামের আগে বাড়তি সম্মানসূচক শব্দ এড়িয়ে চলা, অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল আর আড়ম্বর কমানো, নিজের ছবি সংবলিত ব্যানার এড়িয়ে চলা, সাধারণ মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত না ঘটানো — এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো আসলে একটা বড় বার্তা বহন করে: ক্ষমতা যেন মানুষ থেকে দূরে সরে না যায়।

বিরোধী পক্ষের কড়া সমালোচনার জবাবেও তিনি সাধারণত শালীন, সংযত শব্দ বেছে নেন — ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে যুক্তির ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংঘাতপ্রবণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটা একটা লক্ষণীয় ব্যতিক্রম। আর ইতিহাস বলে, ব্যতিক্রমই কখনো কখনো নতুন নিয়মের জন্ম দেয়।

স্বীকারোক্তির সাহস

দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে রাতারাতি সব প্রত্যাশা পূরণ করা যায় না — বিদ্যুৎ, গ্যাস আর প্রশাসনিক জটিলতার বাস্তব সীমাবদ্ধতা এখনও আছে। এই সীমাবদ্ধতা লুকিয়ে না রেখে সংসদে খোলাখুলি স্বীকার করা, আর মানুষের কাছে আরও কিছুটা সময় ও সহযোগিতা চাওয়া — এটাকে দুর্বলতা না ভেবে বরং রাজনৈতিক বিনয় হিসেবেই দেখা যায়। যিনি নিজের সীমা স্বীকার করতে পারেন, তিনিই আসলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা অর্জনের যোগ্য হয়ে ওঠেন।

শেষ কথা

ইতিহাস মনে রাখে না কার গাড়িবহর কত লম্বা ছিল, কার প্রটোকল কত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। ইতিহাস মনে রাখে, কে ক্ষমতাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল, কে ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়েছিল, আর কে নিজের ভুল আর সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল। তারেক রহমানের পথচলা — তরুণ বয়সের রাজনৈতিক সূচনা থেকে নির্বাসনের দীর্ঘ বছর, আর সেখান থেকে আজকের দায়িত্বের চেয়ার পর্যন্ত — সেই প্রশ্নেরই একটা জীবন্ত উত্তর হয়ে উঠতে পারে, যদি এই সংযম আর জবাবদিহিতার চর্চা অব্যাহত থাকে।

শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সবচেয়ে বড় গয়না কোনো উপাধি নয়, কোনো প্রটোকল নয় — মানুষের আস্থাই তার আসল অলংকার।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team