তারেক রহমান: মানুষের আস্থায় আগামীর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
রাজনীতির পথ কখনো মসৃণ নয়। এই পথ কখনো ফুলে ঢাকা, কখনো কাঁটায় ভরা; কখনো মানুষের ভালোবাসায় আলোকিত, আবার কখনো বিতর্ক, প্রতিকূলতা ও কঠিন পরীক্ষায় আচ্ছন্ন। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—একজন রাজনীতিক মানুষের মনে কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন এবং তাঁর রাজনীতি মানুষের জীবনকে কতটা স্পর্শ করতে পেরেছে?
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে তারেক রহমানকে ঘিরে আলোচনা করতে গেলে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারক—এটি তাঁর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু উত্তরাধিকার কাউকে রাজনীতির দরজায় পৌঁছে দিতে পারে, ইতিহাসে তার জায়গা নিশ্চিত করতে পারে না। ইতিহাসে জায়গা করে নিতে হয় নিজের চিন্তা, কর্ম, ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে।
তারেক রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাকেও তাই শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরির গল্প হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি দেখা হবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৃণমূলের রাজনীতি, দীর্ঘ প্রতিকূলতা, প্রবাসজীবন, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু রাজনৈতিক ধারণা।
মাটির কাছাকাছি রাজনীতি
বাংলাদেশকে বুঝতে হলে কেবল ঢাকাকে বুঝলে চলে না।
বাংলাদেশকে খুঁজতে হয় গ্রামের ধুলোমাখা পথে, কৃষকের জমিতে, নদীর পাড়ে, হাটের চায়ের দোকানে, শ্রমিকের ঘামে এবং বেকার তরুণের চোখে জমে থাকা স্বপ্নে।
তারেক রহমানের রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তৃণমূলের দিকে ফিরে তাকানো। দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর তিনি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে একটি ধারণা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাজনীতির প্রাণ রাজধানীতে নয়, মানুষের মধ্যে।
রাজনীতিতে কথা বলা খুব সহজ; মানুষের কথা শোনা অনেক কঠিন।
একজন কৃষকের কাছে রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোনো জটিল পরিসংখ্যান নয়—তার কাছে অর্থনীতি হলো ফসল ফলানোর খরচ এবং মৌসুম শেষে পাওয়া দাম। একজন তরুণের কাছে উন্নয়ন মানে চকচকে ভবন নয়—তার কাছে উন্নয়ন হলো যোগ্যতা অনুযায়ী একটি কাজ। একজন মায়ের কাছে রাষ্ট্র মানে সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। একজন ব্যবসায়ীর কাছে সুশাসন মানে হয়রানি ছাড়া কাজ করার নিশ্চয়তা।
এই ছোট ছোট চাওয়াগুলোই একত্র হয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দাবি তৈরি করে।
সম্ভবত এখানেই তৃণমূলের রাজনীতির আসল তাৎপর্য।
উত্তরাধিকারের ভেতর নতুন সময়ের সন্ধান
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয় পরিচয়, উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল, তারেক রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যেও সেসবের আধুনিক প্রতিফলন দেখা যায়।
একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক বিকাশে বেগম খালেদা জিয়ার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যে দলকে ধরে রাখার যে রাজনৈতিক অধ্যায় খালেদা জিয়া তৈরি করেছেন, তারেক রহমান সেই পরিবেশের মধ্যেই রাজনীতির কঠিন পাঠ নিয়েছেন।
কিন্তু পৃথিবী বদলেছে।
জিয়াউর রহমানের সময়ের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের তরুণের হাতে স্মার্টফোন, সামনে পৃথিবীর বিশাল কর্মবাজার। কৃষকের হাতে শুধু লাঙল নয়, প্রযুক্তিও পৌঁছে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কও বদলে গেছে।
তাই উত্তরাধিকার ধরে রাখার অর্থ অতীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়।
বরং সময়ের ভাষায় তাকে নতুন করে লেখা।
রাষ্ট্র সংস্কার: স্লোগানের বাইরে মানুষের জীবন
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক চিন্তার বড় অংশজুড়ে রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন।
বিএনপির ৩১ দফায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।
কিন্তু সংস্কার শুধু সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের নাম নয়।
সংস্কার তখনই মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন একজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা পান; কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পান; তরুণ চাকরির সুযোগ পান; নাগরিক সরকারি দপ্তরে গিয়ে হয়রানির শিকার হন না।
তারেক রহমান নিজেও সংস্কারের আলোচনায় মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন—কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাজারব্যবস্থা ও উৎপাদনের মতো বিষয়কে সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখার কথা তুলে ধরেছেন।
এই উপলব্ধিটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সংবিধান রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণ করে, কিন্তু মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাই রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে।
কৃষকের মাঠ থেকেই বাংলাদেশের সমৃদ্ধি
বাংলাদেশের গল্প লিখতে গেলে কৃষকের গল্প বাদ দেওয়ার উপায় নেই।
এই দেশের সভ্যতার সঙ্গে মাটির সম্পর্ক হাজার বছরের। নগর বড় হয়েছে, শিল্প বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে; তারপরও গ্রামের একটি ধানক্ষেত বাংলাদেশের অর্থনীতির পাশাপাশি আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয়েরও অংশ।
তারেক রহমানের রাষ্ট্রচিন্তায় কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষকের ন্যায্য মূল্য তাই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সরকারি ক্রয়কেন্দ্র, শস্য ও অন্যান্য কৃষিবীমা এবং কৃষি গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
কৃষকের জন্য সহানুভূতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি কার্যকর ব্যবস্থা।
এমন ব্যবস্থা, যেখানে কৃষক উৎপাদন করবেন কিন্তু বাজারের কাছে অসহায় হবেন না। দুর্যোগ এলে তাঁর বছরের পরিশ্রম এক রাতে নিঃশেষ হয়ে যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্য তাঁর কাছে পৌঁছাবে। উৎপাদক ও বাজারের মাঝখানের অপ্রয়োজনীয় দেয়ালগুলো ছোট হবে।
কৃষকের ঘরে স্বস্তি না ফিরলে উন্নয়নের আলোও পূর্ণতা পায় না।
কারণ মাটি ভালো থাকলে ফসল জন্মায়, কৃষক ভালো থাকলে দেশ বাঁচে।
তরুণের হাতে নতুন বাংলাদেশের চাবি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার তরুণ জনগোষ্ঠী।
এই তরুণদের শুধু রাজনৈতিক সভার জনতা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের দেখতে হবে উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ, শিক্ষক, প্রকৌশলী, শিল্পী এবং আগামী দিনের নীতিনির্ধারক হিসেবে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রযুক্তি, আধুনিক শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান বারবার গুরুত্ব পেয়েছে। ৩১ দফাতেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের কথা রয়েছে।
একজন তরুণ কেন শুধু চাকরির জন্য রাজধানীর দিকে তাকিয়ে থাকবেন?
একটি গ্রামের ঘরে বসেই যদি তিনি পৃথিবীর কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করতে পারেন, ডিজিটাল সেবা দিতে পারেন কিংবা নিজের উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে পারেন—তবে সেটিই হবে প্রযুক্তির প্রকৃত গণতন্ত্রায়ন।
প্রযুক্তি তখনই বিপ্লব, যখন তা মানুষের জীবন বদলায়।
যখন প্রযুক্তি গ্রামের সঙ্গে শহরের দূরত্ব কমায়, প্রশাসনের দরজা নাগরিকের কাছে খুলে দেয় এবং মেধাবী তরুণকে নিজের দেশেই স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়।
সবুজ বাংলাদেশও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
একটি রাষ্ট্র শুধু মানুষকে নিয়ে গড়ে ওঠে না।
তার নদী আছে, বন আছে, পাখি আছে, প্রাণী আছে, মাটি আছে। আছে বর্ষার জল, শরতের আকাশ আর গ্রামের পুরোনো বটগাছ।
তাই পরিবেশের প্রশ্নটিও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন।
তারেক রহমান পরিবেশ, বৃক্ষরোপণ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, কৃষির আধুনিকায়ন ও টেকসই নগরায়নকে তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিএনপির ৩১ দফার পরিবেশ ও বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত অঙ্গীকারের সঙ্গেও এসব ধারণা যুক্ত।
প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অনুরাগের কথাও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত ভালোবাসা তখনই রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়, যখন তা রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত হয়।
আমাদের এমন উন্নয়ন প্রয়োজন নেই, যেখানে ভবনের উচ্চতা বাড়ে কিন্তু গাছের সংখ্যা কমে।
এমন শহরও চাই না, যেখানে মানুষের গাড়ি রাখার জায়গা আছে, কিন্তু শিশুর খেলার মাঠ নেই; মানুষের বসবাসের অট্টালিকা আছে, অথচ পাখির বসার ডাল নেই।
উন্নয়ন ও প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ ভাবার দিন শেষ।
আগামী বাংলাদেশের উন্নয়ন হতে হবে সবুজ, মানবিক ও টেকসই।
রাজনীতির ভাষাটাও বদলাতে হবে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো অসহিষ্ণুতা।
আমরা বহুদিন ধরে এমন এক রাজনৈতিক ভাষায় অভ্যস্ত হয়েছি, যেখানে মতের বিরোধ কখনো কখনো মানুষের বিরোধে পরিণত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিযোগী না ভেবে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা আমাদের গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।
এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত ভাষায় কথা বলে, তৃণমূলেও তার প্রভাব পড়ে। নেতা যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করেন, কর্মীরাও অপমানকে রাজনীতি মনে করতে শুরু করেন। আবার নেতা যদি যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেন এবং ভিন্নমতকে রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে মেনে নেন, নিচের দিকেও একটি আলাদা সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সবাই একই কথা বলবে—এতে নয়।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, আমরা ভিন্ন কথা বলব, তবু একই দেশের নাগরিক হিসেবে একে অন্যের অধিকারের পাহারাদার থাকব।
প্রতিকূলতা যে মানুষকে বদলে দেয়
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন বিতর্ক ও প্রতিকূলতামুক্ত ছিল না।
মামলা, কারাবরণ, রাজনৈতিক সংঘাত এবং দীর্ঘ প্রবাস তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। তাঁকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী মূল্যায়নও রয়েছে। সমর্থকেরা তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আলোকে দেখেছেন, বিরোধীরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ইতিহাসের দায়িত্ব হলো আবেগের বাইরে গিয়ে এসব ঘটনার বিচার করা।
কিন্তু প্রতিকূলতারও একটি নিজস্ব শিক্ষা আছে।
আগুন যেমন ধাতুকে পরীক্ষা করে, কঠিন সময়ও মানুষকে পরীক্ষা করে। কখনো মানুষ ভেঙে পড়ে, কখনো বদলে যায়, আবার কখনো আরও ধৈর্যশীল হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকেও তারেক রহমান প্রযুক্তির মাধ্যমে দলীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ধরে রেখেছেন। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নেতৃত্বের একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
সময়ের দূরত্ব হয়তো মানুষকে আরও একটি শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক আচরণের স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী।
ক্ষমতার জৌলুস নয়
রাজনীতিতে ক্ষমতার চারপাশে খুব সহজেই একটি কৃত্রিম পৃথিবী তৈরি হয়।
গাড়িবহর বাড়ে। নিরাপত্তার দেয়াল উঁচু হয়। নামের আগে বিশেষণ বাড়ে। দেয়ালে দেয়ালে ছবি ওঠে।
একসময় নেতা হয়তো মানুষের মাঝেই থাকেন, অথচ মানুষের জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যান।
এই দূরত্বই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ।
একজন রাষ্ট্রনায়কের উচ্চতা তাঁর গাড়িবহরের দৈর্ঘ্যে নয়; মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতায়।
তাঁর ছবির ব্যানার কত বড়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—তাঁর সময়ে একজন সাধারণ নাগরিক নিজের রাষ্ট্রের সামনে কতটা মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন।
ক্ষমতার আসল সৌন্দর্য প্রদর্শনে নয়, সংযমে।
আর নেতৃত্বের আসল শক্তি ভয় তৈরি করায় নয়, আস্থা তৈরি করায়।
নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরেকটি পরিবর্তন প্রয়োজন।
সাফল্য নিজের, ব্যর্থতা অন্যের—এই সহজ সমীকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সব সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই জনগণের সামনে সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা কোনো নেতার দুর্বলতা নয়।
বরং কখনো কখনো ‘আমরা এখনো পারিনি’—এই তিনটি শব্দ ‘আমরাই সব পেরেছি’ বলার চেয়ে অনেক বেশি সাহসের পরিচয় বহন করে।
তবে শুধু স্বীকার করলেই চলবে না।
মানুষ ফলাফলও চায়।
একজন কৃষক জানতে চান, তাঁর উৎপাদনের দাম বাড়ল কি না। একজন তরুণ জানতে চান, কাজ পেলেন কি না। একজন রোগী জানতে চান, হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেন কি না। একজন নাগরিক জানতে চান, থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার পেলেন কি না।
শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনই সরকারের সবচেয়ে নির্ভুল Performance Indicator।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
তারেক রহমানকে নিয়ে প্রশংসা আছে, প্রত্যাশা আছে, সমালোচনাও আছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সেটিই স্বাভাবিক।
কিন্তু আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাঁর ব্যক্তিত্ব নিয়ে নয়; তাঁর ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়—তা নিয়ে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে?
কৃষক সত্যিই ন্যায্য মূল্য পাবেন কি?
তরুণ মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পাবেন কি?
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারবেন কি?
গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারবে কি?
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে কি?
এগুলোই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।
কারণ একজন রাজনীতিকের স্বপ্নের বিচার তাঁর বক্তৃতার সৌন্দর্য দিয়ে হয় না; হয় সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা
বাংলাদেশ বহু ঝড়ের দেশ।
এই দেশের মানুষ ঘূর্ণিঝড় দেখেছে, বন্যা দেখেছে, রাজনৈতিক উত্থান-পতন দেখেছে। আবার প্রতিবারই ধ্বংসস্তূপের পাশে নতুন ঘর তুলেছে।
বন্যার পানি সরে গেলে কৃষক আবার বীজ হাতে মাঠে নেমেছেন।
অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক, এই ভূখণ্ডের মানুষ ভোরের অপেক্ষা করতে জানে।
তারেক রহমানের সামনে আজ তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্ন নেই; রয়েছে মানুষের প্রত্যাশাকে ধারণ করার কঠিন দায়িত্ব। তাঁর সামনে সুযোগ রয়েছে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার, যেখানে ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে সেবা বড়, প্রতিহিংসার চেয়ে সহনশীলতা বড়, ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় এবং স্লোগানের চেয়ে কাজ বড়।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত এখানেই নির্ধারিত হবে।
ইতিহাস কোনো প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির নম্বর মনে রাখে না।
ইতিহাস মনে রাখে—তাঁর সময়ে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ ছিল।
ইতিহাস কোনো নেতার নামের আগে ব্যবহৃত বিশেষণের সংখ্যা গোনে না।
ইতিহাস মনে রাখে—তিনি কতটা জবাবদিহি করেছিলেন।
ইতিহাস দেয়ালে টাঙানো প্রতিকৃতি মনে রাখে না।
ইতিহাস মনে রাখে মানুষের মুখ।
সেই মুখে হাসি ছিল, নাকি হতাশা—শেষ বিচারে সেটিই হয়ে ওঠে একটি সরকারের সবচেয়ে বড় ইতিহাস।
ক্ষমতার চেয়ার মানুষ দেয়, আবার মানুষই ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে আসন তৈরি হয়, তার কোনো নির্বাচনকাল নেই, কোনো প্রটোকল নেই, কোনো বিশেষণও প্রয়োজন হয় না।
সেই আসনে পৌঁছানোর পথ একটাই—মানুষের কাছে যাওয়া, মানুষের কথা শোনা, ভুল হলে স্বীকার করা এবং রাষ্ট্রের শক্তিকে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর বদলে মানুষের মর্যাদা বাড়াতে ব্যবহার করা।
তারেক রহমানের সামনে ইতিহাসের পরীক্ষাটিও তাই ক্ষমতার নয়—আস্থার।
বাংলাদেশের রাজনীতি যদি সত্যিই নতুন পথে হাঁটতে চায়, তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় সাইনবোর্ড হতে হবে না কোনো ব্যক্তির নাম। সেখানে লেখা থাকা উচিত—জনগণ।
কারণ গণতন্ত্রে একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাফল্য তিনি নিজে কতটা ক্ষমতাবান হলেন, তা নয়।
তাঁর নেতৃত্বে দেশের মানুষ কতটা ক্ষমতাবান হলো—ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই হিসাবটিই রাখে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment