সংকট সমাধানের নামে সংকট বাড়ানো? ১১ দলের লং মার্চের যৌক্তিকতা কোথায়?

0

সংকট সমাধানের নামে সংকট বাড়ানো? ১১ দলের লং মার্চের যৌক্তিকতা কোথায়? 

দেশে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সার সংকট নিরসনের দাবি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি। জনগণের দুর্ভোগ কমানোর দাবি। কিন্তু সেই দাবিগুলো সামনে রেখে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত শত শত, এমনকি আয়োজকদের ঘোষণায় প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার গাড়ির বহর নিয়ে রাজনৈতিক ‘লং মার্চ’—এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ছয় দফার মধ্যে বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসনের দাবি রয়েছে। অথচ জ্বালানি সংকটের কথা বলেই তাদের নিজেদের কর্মসূচির গাড়ির সংখ্যা কমানোর কথা ছিল। কিন্তু জ্বালানি সংকটের এ চরম মুহূর্তেও প্রায় দেড় দুই হাজার গাড়ির বহরে চলে ঢাকা চট্টগ্রামে রোড শো।  

এখানেই প্রশ্ন—যে তেল-গ্যাসের সংকট সমাধানের দাবি জানানো হচ্ছে, সেই সংকটের মধ্যেই হাজার হাজার গাড়ির বহর রাস্তায় নামিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ানো কি সংকট সমাধানের কোনো রাজনৈতিক কৌশল, নাকি সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলার এক ধরনের অপচয়?

গাড়ির সংখ্যা যদি দেড় থেকে দুইহাজার হাজার ধরা হয়, একই অনুমানে যাওয়া-আসায় জ্বালানি খরচের মূল্য প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি চলে যায়। এর সঙ্গে গাড়ি ভাড়া, চালকের পারিশ্রমিক, টোল, খাবার, স্থানীয় পরিবহন ও অন্যান্য সাংগঠনিক খরচ যোগ হলে মোট ব্যয় আরও বাড়বে। এসব খাতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব আয়োজকেরা প্রকাশ না করলেও মোট খরচ ৫ কোটি টাকারও বেশি।  

আরও বড় প্রশ্ন জনভোগান্তি। নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবি জানিয়ে যদি দীর্ঘ গাড়িবহর মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, তাহলে সেই কর্মসূচির খরচ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? রাজনৈতিক দলের কর্মীরা হয়তো কর্মসূচিকে সমর্থন করবেন, কিন্তু মহাসড়কে আটকে থাকা সাধারণ মানুষ, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করা পরিবহন মালিক এবং যাত্রীদের কাছে এই আন্দোলনের মূল্য কে দেবে?

‘লং মার্চ’ নাম নিয়েও প্রশ্ন আছে। ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লং মার্চ ছিল একটি নির্দিষ্ট জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে মানুষের গণঅভিযাত্রা। আর এবারের কর্মসূচির দৃশ্যমান কাঠামো মূলত গাড়িবহর, পথসভা ও সমাবেশ। ফলে এটিকে লং মার্চ বলা রাজনৈতিকভাবে বৈধ হলেও এর প্রকৃতি অনেক বেশি মোটরকেডনির্ভর রোড মার্চের মতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল কর্মসূচি দেবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু কর্মসূচিরও যৌক্তিকতা থাকতে হয়। যদি লক্ষ্য হয় তেল-গ্যাস সাশ্রয়, তাহলে হাজার হাজার গাড়ির বহর কেন? যদি লক্ষ্য হয় জনগণের দুর্ভোগ কমানো, তাহলে এমন কর্মসূচি কেন যা মহাসড়কে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে? যদি লক্ষ্য হয় দ্রব্যমূল্য কমানো, তাহলে এই বিপুল সাংগঠনিক ব্যয়ের অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছতা কোথায়?

তাই ১১ দলীয় জোটের কাছে প্রশ্নটি এখন শুধু ‘ছয় দফা কী’—তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই লং মার্চের খরচ ও জ্বালানি ব্যবহার কি তাদের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?

সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যদি সেই সংকটের একটি অংশের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি আর জনস্বার্থের আন্দোলন থাকে না; বরং হয়ে ওঠে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ব্যয়বহুল আয়োজন।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বিচার করবে—এই লং মার্চে জনগণের কোনো বাস্তব সংকট কমেছিল, নাকি শুধু রাজনীতির মঞ্চে একটি বড় গাড়িবহর দেখা গিয়েছিল।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team