একদিকে লংমার্চ, অন্যদিকে ৩৪ এমপির বিদেশ সফর: জামায়াতের ভণ্ডামির রাজনীতি

0


একদিকে লংমার্চ, অন্যদিকে ৩৪ এমপির বিদেশ সফর: জামায়াতের ভণ্ডামির রাজনীতি

একদিকে রাজপথে “১৮ কোটি মানুষের দাবি” নিয়ে লংমার্চ। অন্যদিকে সেই একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্য পরিবার-পরিজনসহ দেশের বাইরে। এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি—যে জনগণের দুর্ভোগ, দ্রব্যমূল্য ও সংকটের কথা বলে জামায়াত রাজপথে আন্দোলন করছে, সেই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ৩৪ এমপি ঠিক সেই সংকটের মুহূর্তে কোথায়?

১৩ সেপ্টেম্বর থেকে জামায়াতের ৩৪ এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন নেতা মিলিয়ে ৭১ জনের একটি দল বিদেশ সফরে রয়েছে। মালয়েশিয়ার পর ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁরা সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন; সেখানে সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা প্রকাশিত হয়েছে। জামায়াত এটিকে শিক্ষামূলক ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সফর হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

কিন্তু সময়টাই এখানে বড় প্রশ্ন। ১৯ সেপ্টেম্বর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছে। তাদের আট দফার মধ্যে রয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি-বিদ্যুৎ-সারের সংকট সমাধান, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো বিষয়। জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তাঁরা “১৮ কোটি মানুষের” দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন এবং প্রয়োজনে আট দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে।

তাহলে প্রশ্নটা খুব সরল: জনগণের সংকট যদি এতটাই জরুরি হয় যে তা নিয়ে লংমার্চ করতে হয়, তাহলে সেই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের ৩৪ জন এমপির একসঙ্গে বিদেশে থাকা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? একজন-দুজন এমপির ব্যক্তিগত সফর হলে সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু বিরোধী দলের ৩৪ জন সংসদ সদস্যের সঙ্গে পরিবারসহ মোট ৭১ জনের বিদেশযাত্রা—ঠিক লংমার্চের কর্মসূচির সময়—স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। এটাকে বেআইনি বলা যাচ্ছে না; কিন্তু রাজনৈতিক সামঞ্জস্য ও জনদায়বদ্ধতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও কঠিন।

আর এখানেই জামায়াতের কথার সঙ্গে কাজের একটি দৃশ্যমান বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দলের নেতারা বলছেন, তাঁরা জনগণের দুর্ভোগের কারণে রাস্তায়; সরকারকে জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে; এমনকি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। অথচ একই সময়ে দলের ৩৪ এমপির বড় একটি অংশ দেশের বাইরে। ফলে সমালোচকের প্রশ্ন—জনগণের জন্য রাজনীতি কি শুধু মাঠের কর্মীদের দায়িত্ব, আর জনপ্রতিনিধিদের জন্য আলাদা জীবনযাপন?

জামায়াতের পক্ষ থেকে দেয়া পাল্টা যুক্তি অত্যন্ত ঠুনকো। সফরটি তাদের ভাষায় শিক্ষামূলক; সংসদ, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনই এর উদ্দেশ্য। সফরকে অনেকে বলছে নিছক “বিলাসভ্রমণ”। জামায়াত জীবনে এই সুযোগ পেয়েছে হাতছাড়া করতে চায় না। সরকারি টাকায় সফর বলে কথা।  

কিন্তু রাজনীতিতে সময় ও প্রতীক—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। যে দল জনগণের কষ্টকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে, তাদের নিজেদের আচরণেও সেই একই সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত। বিশেষ করে যখন লংমার্চের নেতারা বলছেন তাঁরা “১৮ কোটি মানুষের” দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন, তখন ৩৪ এমপির একযোগে বিদেশ সফর অন্তত একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনে: জনগণের কষ্ট কি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয়, নাকি জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের রাজনৈতিক আচরণেও তার প্রতিফলন থাকা উচিত?

এই জায়গাটিই জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পরীক্ষা। এই সময়ে এরকম একটি সফর বৈধ কি না, সেটি এক প্রশ্ন। এটি জনদায়বদ্ধতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিও আরেক ভিন্ন প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ স্পষ্টভাবে দেওয়া না হচ্ছে, ততক্ষণ “জনগণের দাবি”র লংমার্চ আর একই সময়ে ৩৪ এমপির বিদেশ সফর—জামায়াতের ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। 

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team