আগে গুম খুনের বিচার হোক- তারপর রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন
একটি রাষ্ট্রে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দগুলোর একটি—গুম।
কারণ গুম মানে শুধু একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলা নয়।
গুম মানে—একটি পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষার মধ্যে রেখে দেওয়া।
একজন মা জানেন না, তাঁর সন্তান বেঁচে আছে কি না।
একজন স্ত্রী জানেন না, তাঁর স্বামী কোথায়।
একটি সন্তান জানে না—তার বাবাকে শেষবার কোথায় দেখা গিয়েছিল।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার নথিতেও বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম ও বেআইনি আটক নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
মানবাধিকার সংগঠন Odhikar-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ৭০৯ জনকে জোরপূর্বক গুমের শিকার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৭১ জন পরে ফিরে এসেছেন বা আদালতে হাজির হয়েছেন, ৮৩ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, আর ১৫৫ জন তখনও নিখোঁজ ছিলেন।
অর্থাৎ, এখানে শুধু সংখ্যা নেই—আছে শত শত পরিবার, যাদের জীবনে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ছায়া নেমে এসেছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— অধিকাংশ গুম খুন ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত, নাগরিকের বাকস্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করার জন্য। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদী কণ্ঠ তৈরি হলেই নেমে আসত নির্যাতন।
আর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এ পরিস্থিতি পৌঁছায় এক ভয়াবহ পর্যায়ে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত পরিণত হয় ব্যাপক গণআন্দোলনে।
এরপর শুরু হয় প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ও দমন-পীড়ন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ৩২ জন শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। ছাত্র অভ্যুত্থান দমনের নামে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ও অসমতাপূর্ণ বলপ্রয়োগের অভিযোগও সেখানে উঠে আসে।
পরবর্তীতে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ fact-finding তদন্ত আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
OHCHR-এর হিসাব অনুযায়ী, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তদন্তকারীরা শত শত মানুষের হত্যার বিষয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্রের কথাও উল্লেখ করেছেন।
ভাবুন—
মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় ১,৪০০ প্রাণ।
এদের মধ্যে ছিল ছাত্র।
ছিল শ্রমজীবী মানুষ।
ছিল শিশু।
ছিল সাধারণ পথচারী।
এ কারণেই জুলাই ২০২৪ শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস নয়—এটি বাংলাদেশের মানবাধিকার ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রশ্ন করুন —কে তখন ক্ষমতায় ছিল, কারা এই ছাত্র জনতার উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বল প্রয়োগ করেছিল?
প্রশ্ন হলো—
একজন নাগরিক কতোটা নিরাপদ ছিল সেই সময়ে?
একটি পরিবার কি বছরের পর বছর তার নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পেয়েছিল?
সরকার কীভাবে তখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দিয়ে এরকম জঘন্য অপরাধগুলো করিয়েছিল ভাবা যায়?
গুমের প্রতিটি অভিযোগের সত্য উদঘাটন, প্রতিটি বেআইনি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার—এগুলো এখন সময়ের দাবি।
এগুলো একজন নাগরিকের অধিকার। এগুলো হওয়ার আগে কোনো রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন নয়। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের মাটিতে দেখতে চাই না।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment