দেশ বাঁচাতে নয়, দল বাঁচাতে লং মার্চ!

0

দেশ বাঁচাতে নয়, দল বাঁচাতে লং মার্চ!

স্বাগতম প্রিয় শ্রোতা বন্ধুরা! আজকে একটু হালকা মেজাজে শুরু করি। কারণ হামাগোরে নেতারা সব ঢাকার বাইরে গেছিল, ঢাকা ফাঁকা। কিন্তু খবর কি চাউর হইছে জানেন? 

দেশে নাকি মহাসংকট! তেল নেই, গ্যাস নেই, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নেই—আর জনগণও নাকি হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই ভাবলাম, এবার নিশ্চয়ই এমন একটা লং মার্চ হবে, যেখানে মানুষ পায়ে হাঁটবে, ঘাম ঝরাবে, ধুলো খাবে, স্লোগান দেবে—দেশ বাঁচাবে!

কিন্তু না! 

ভুল বুঝেছেন।

এবারের লং মার্চে দেশ বাঁচানোর চেয়ে দল বাঁচানোই বেশি জরুরি!

কারণ ভাই, দেশ তো কোনোভাবে চলছে।

কিন্তু দল?

দলকে তো দৃশ্যমান রাখতে হবে!

দলকে বলতে হবে—“আমরাও আছি!”

আর সেই ‘আমরাও আছি’ জানানোর সবচেয়ে আধুনিক উপায়?

গাড়ির বহর!


🚗 লং মার্চ নাকি লং ড্রাইভ?

একসময় লং মার্চ মানে ছিল মানুষ। আর এখন লং মার্চ মানে—গাড়ি।

আগে মানুষ হাঁটত, এখন গাড়ি হাঁটে। আগে নেতারা বলতেন—“জনগণের কষ্ট বুঝতে আমরা মানুষের সঙ্গে হাঁটছি।”

এখন হয়তো বলা যায়—

“জনগণের কষ্ট বুঝতে আমরা এসি গাড়ির ভেতর থেকে জনগণের দিকে তাকাচ্ছি!”

আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানেন?

দাবির তালিকায় তেল-গ্যাস সংকট সমাধান আছে।

অর্থাৎ—

তেল-গ্যাস নেই, তাই তেল-গ্যাস বাঁচাতে হবে।

কীভাবে?

প্রায় এক হাজার গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে হবে!

এটা ঠিক সেই রকম—

“ভাই, দেশে পানি সংকট। তাই সবাই মিলে পানি খরচ করে পানি সংকটের প্রতিবাদ করি!”

একটা গাড়ি যদি গড়ে ১০ কিলোমিটার চলে এক লিটার জ্বালানিতে, তাহলে ঢাকা–চট্টগ্রাম যাতায়াতে এক হাজার গাড়ির জ্বালানি খরচ কত হতে পারে—সেটা হিসাব করলেই মাথা ঘুরে যেতে পারে।

এর সঙ্গে আছে গাড়ি ভাড়া।

চালকের খরচ।

টোল।

খাবার আয়োজন। মাইক ভাড়া। পথসভা। 

আর আছে—রাজনৈতিক ইমেজ ম্যানেজমেন্ট!

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা খুব সহজ:

এই টাকা যদি সত্যিই জনগণের জন্য খরচ করার মতো টাকা হয়, তাহলে সেটা পোড়ানো হলো কেন? 

তবে অবশ্যই এখানে একটা কথা আছে—

এটা তাদের দলীয় টাকা।

তারা চাইলে গাড়ি চালাবেন, বাস চালাবেন, এমনকি সাইকেলেও যাবেন। 

কিন্তু যখন দাবি করা হচ্ছে—“আমরা জনগণের সংকট সমাধানের জন্য আন্দোলন করছি”, তখন জনগণের স্বার্থের সঙ্গে কর্মসূচির খরচের একটা সামঞ্জস্য থাকা উচিত।

এবার আসুন ভাসানীর লং মার্চ হামাগেরে আমির সাবের এসি গাড়ির লং মার্চ নিয়ে এবার কথা কই- 

১৯৭৬ সালে হয় ফারাক্কা লং মার্চ। সামনে পানি। পেছনে মানুষ।

দাবি একটা—পানির ন্যায্য হিস্যা। 

সেই আন্দোলনের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার সরাসরি সম্পর্ক।

আর ২০২৬? সামনে ছয় দফা।

পেছনে গাড়ির বহর।

আর মাঝখানে প্রশ্ন—

“লং মার্চ, নাকি লং ড্রাইভ?”

তবে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে একটা কথা অবশ্যই বলতে হবে—

গাড়িতে রাজনৈতিক দীর্ঘযাত্রা নতুন কিছু নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রোড মার্চ’ বহুবার হয়েছে।

সমস্যা গাড়িতে নয়।

সমস্যা হলো নাম আর বাস্তবতার ব্যবধান।

যদি গাড়িতে যেতে হয়, যান। 

কিন্তু তাহলে নামটা “রোড মার্চ” হলে এত প্রশ্ন উঠত না।

‘লং মার্চ’ বললেই ভাসানী এসে মাথায় টোকা দেন—

“বাপু, আমার লং মার্চের সঙ্গে তোমাদেরটা মিলাইও না!”

আসল উদ্দেশ্য কী?

এখন আসি আসল জায়গায়।

দেশ বাঁচানোর জন্য লং মার্চ?

নাকি দলকে রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান রাখার জন্য?

কারণ রাজনীতিতে একটা কঠিন সত্য আছে—

যে দল রাস্তায় নেই, সেই দলের খবরও নেই।

তাই রাস্তায় থাকতে হবে।

ক্যামেরায় থাকতে হবে।

শিরোনামে থাকতে হবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

জোটকে জীবিত রাখতে হবে।

জামায়াতের দরকার বড় রাজনৈতিক জোট।

এনসিপির দরকার মাঠের সংগঠন।

দুই পক্ষের দরকার একে অপরকে।

তাই এই লং মার্চকে শুধু “ছয় দফা আদায়ের আন্দোলন” বললে পুরো গল্পটা বলা হয় না।

এটা হতে পারে—

কে বিরোধী রাজনীতির মাঠে সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়—তার একটা মহড়া।

নাহিদ ভাইয়ের ছয় দফা থেকে এক দফা?

আরেকটা মজার ব্যাপার আছে।

আগে বলা হলো—

“সরকার পতনের আন্দোলন নয়।”

তারপর বলা হলো—

“বাধা দিলে ছয় দফা এক দফা হয়ে যাবে।”

মানে কী?

ছয় দফা আসলে ছয় দফা নয়?

এটা কি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র?

প্রথমে ছয়টা প্রশ্ন।

উত্তর না দিলে—

“স্যার, তাহলে একটা প্রশ্নই রাখলাম—সরকার থাকবেন, না যাবেন?”

রাজনীতির ভাষায় এটাকে বলা যায় চাপ সৃষ্টি।

পল্টিবাজদের ভাষায়—

“দফা কমানোর অফার—আজ ছয়, কাল এক!”

শেষ কথা তাই প্রিয় শ্রোতা,

এই লং মার্চের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

দেশ কি সত্যিই এতটাই সংকটে যে হাজার গাড়ির বহর নিয়ে রাস্তায় নামতে হলো?

নাকি সংকটটা একটু অন্য জায়গায়?

দলকে দৃশ্যমান করার সংকট।

জোটকে ধরে রাখার সংকট।

রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার সংকট।

আর সেই সংকটের চিকিৎসা—

লং মার্চ!

দেশ বাঁচুক—অবশ্যই।

জনগণ বাঁচুক—তার চেয়েও জরুরি।

কিন্তু তার আগে হয়তো একটা ছোট্ট কাজ দরকার—

দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎটা বাঁচাক!

তারপর না হয় দেশ বাঁচানো যাবে।

আজকের শেষ প্রশ্নটা তাই খুব সহজ—

“এই লং মার্চে কত কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেওয়া হলো—সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা, রাজনৈতিকভাবে কতদূর এগোল ১১ দল?”

আমি থাকলাম এখানেই।

আবার দেখা হবে পরের রাজনৈতিক ব্যঙ্গের আসরে।

ততক্ষণ পর্যন্ত—তেল বাঁচান, গ্যাস বাঁচান, আর সম্ভব হলে লং মার্চের জন্য গাড়িটাও একটু কম চালান!


No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team