“বন্দুকযুদ্ধ নাকি পরিকল্পিত হত্যা? ১৫ বছরের অন্ধকার অধ্যায়”
২০০৮ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪।
বাংলাদেশের রাজনীতির এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল আওয়ামী লীগ।
এই সময়ের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বিচারবহির্ভূত হত্যা, যাকে অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’।
বিএনপির অভিযোগ, এই সময়ে সারাদেশে ২ হাজার ২৭৬ জনকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে। তাদের দাবি, নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৬ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ASK-এর হিসাব বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৫ বছরে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন।
আর পুলিশের Special Branch-এর নথিতেও ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এক হাজারের বেশি কথিত ক্রসফায়ার ঘটনায় ১ হাজার ২৯৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
তাহলে প্রশ্ন,
এসব কি সত্যিই বন্দুকযুদ্ধ ছিল?
নাকি কিছু মানুষকে আগে আটক করে পরে হত্যা করা হয়েছিল?
বহু পরিবার বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ করেছে, তাদের স্বজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে খবর এসেছে, তিনি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
এই অভিযোগ শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই ওঠেনি।
Human Rights Watch এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ততকালীন RAB ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র RAB-এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এরপর আসে ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী অভিযান।
মাদক নির্মূলের নামে দেশজুড়ে অভিযান চলাকালে বহু মানুষ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুও সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। রাষ্ট্রীয় বর্ণনায় সেটি ছিল বন্দুকযুদ্ধ। কিন্তু তার পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
আর তারপর আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট।
ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণআন্দোলন দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ পর্যন্ত নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
এই সময়ের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের অভিযোগ পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হয়।
শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়। বর্তমানে তিনি ভারতে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন।
কিন্তু এই সংখ্যাটা ২ হাজার ২৭৬ হোক বা ১ হাজার ৯২৬ অথবা অন্য কোনো সংখ্যা।
সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন একজন করে মানুষ।
একটি পরিবার।
একটি জীবন।
একটি অসমাপ্ত গল্প।
তাই প্রশ্নটি শুধু কতজন মারা গেছেন, তা নয়।
প্রশ্ন হলো, কার নির্দেশে?
কোন বাহিনীর হাতে?
কোন পরিস্থিতিতে?
আর কেন তাদের মৃত্যুকে ‘ক্রসফায়ার’ বলা হয়েছিল?
প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, নথি যাচাই এবং আদালতের মাধ্যমে দায় নির্ধারণই পারে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে।
কারণ সরকারে থাকা অবস্থায় এসব ঘটনার নির্দেশদাতা দায় এড়াতে পারে না। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, আইন এবং মানবাধিকারের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা।
সত্য প্রকাশের পরীক্ষা। ন্যায়বিচারের পরীক্ষা।
এবং সবচেয়ে বড় কথা,
ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকারই রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নাগরিকের জীবন কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেই নিশ্চয়তার পরীক্ষা।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment