ভিউ বাণিজ্যের ভিন্ন নিশ বেছে নিয়েছেন সালাহ উদ্দীন শোয়েব চৌধুরী: হাসিনা, খ্রিস্টান রাষ্ট্র ও মার্কিন ইস্যু

0

ভিউ বাণিজ্যের ভিন্ন নিশ বেছে নিয়েছেন সালাহ উদ্দীন শোয়েব চৌধুরী: হাসিনা, খ্রিস্টান রাষ্ট্র ও মার্কিন ইস্যু

ব্লিটজ সম্পাদক সালাহ উদ্দীন শোয়েব চৌধুরী তার ইউটিউব চ্যানেলে ”শেখ হাসিনার বিষয়ে আমেরিকার সিদ্ধান্ত আসছে!” শীর্ষক একটি লাইভ শো করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন-যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক অবস্থান না নেওয়া মানে ওয়াশিংটন গোপনে হাসিনার সঙ্গে দরকষাকষি করছে, বিএনপি থেকে সরে যাচ্ছে এবং যেকোনো মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা দিয়ে হাসিনাকে ফেরাবে। তিনি একে আমেরিকার ‘হাড়ির খবর’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

তার এই এই ব্যাখ্যা আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের নাকি তার মনগড়া? 

আমেরিকা যা বলেছে, যা বলেনি- 

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন-ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিংয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি বড় উত্তেজনার কারণ। তাই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান খুঁজুক। হাসিনার সঙ্গে কী হওয়া উচিত, তা তারা নির্দিষ্ট করে বলেনি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তোলা না-তোলার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারের। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বিএনপি সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ‘খুবই সুস্থ ও শক্তিশালী’ এবং তারা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কাজ চালিয়ে যাবে।

এটা গোপন সংকেত নয়। এটা কূটনৈতিক নন-ইন্টারফারেন্সের ভাষা। ওয়াশিংটন বলছে না—হাসিনাকে ফেরত দাও, ফাঁসি স্থগিত করো, নিষেধাজ্ঞা তোলো। বলছে না—হাসিনাকে গ্রেপ্তার করো। বলছে শুধু, এটা ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় বিষয়, আমরা নির্দেশ দিচ্ছি না।

শোয়েব চৌধুরী এই বক্তব্যটাকেই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ‘দরকষাকষি’ ও ‘নতুন পরিকল্পনা’ বানিয়েছেন। কিন্তু একই ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে তারা বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। যে বাক্য তিনি বাদ দিয়েছেন, সেটাই মূল বার্তা।

দ্বিতীয়ত, তারেক রহমানের দিল্লি সফর: আমন্ত্রণ আছে, ‘না যাওয়ার নাটক’ নয়- 

শোয়েব চৌধুরীর মতে, ভারত এখন তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানাবে কি না সন্দেহ। বাস্তবতা উল্টো। ভারত ইতিমধ্যে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দিয়েছে। দুই পক্ষ নভেম্বরের শেষার্ধে তারিখ খুঁজছে বলে ভারতীয় ও বাংলাদেশি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার পরও আলোচনা থেমে যায়নি। 

দিল্লি সফর হলেই হাসিনা ইস্যুতে ‘সমঝোতা হয়ে যাবে’—এমন দাবিও অনুমান। সফরের এজেন্ডা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বাণিজ্য, পানি চুক্তি, সীমান্ত—এসবই আলোচ্য। হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত যৌথ ঘোষণা আসবে—এমন কোনো সরকারি ইঙ্গিত নেই। তবুও সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী মনগড়া উক্তি দিয়েই যাচ্ছেন। 

যেসব দাবি বা গুজব তিনি বারবার বলছেন: 

তার মতে, সেন্ট মার্টিন ও মহেশখালীতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি: এই দাবি বছরের পর বছর ঘুরেছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার অস্বীকার করেছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বলেছেন, তার সময়কালে এমন কোনো প্রস্তাব তিনি শোনেননি, দ্বীপটি ঘাঁটির জন্য ভৌগোলিকভাবেও অযৌক্তিক। এএফপি ফ্যাক্টচেক ও বাংলাদেশ সরকারও দ্বীপ হস্তান্তরের গুজব মিথ্যা বলেছে।

মি চৌধুরী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের অংশ নিয়ে ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’: পূর্ব তিমুরের সঙ্গে তুলনা করে এটি উপস্থাপন করেছেন। কোনো মার্কিন নীতিপত্র, কংগ্রেস শুনানি বা প্রতিরক্ষা নথিতে এমন পরিকল্পনার প্রমাণ নেই। ইউনূসের পূর্ব তিমুর সফরকে সেই চক্রান্তের প্রমাণ বলা কূটনৈতিক সৌজন্য সফরকে ষড়যন্ত্রে রূপান্তর।

ভলকার টুর্ক ও সেনাবাহিনী- 

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ২০২৪-এর সহিংসতায় সেনাবাহিনীকে শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ দেওয়ার সতর্কতার কথা পরে বলেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বলেছে, তারা সরাসরি এমন বার্তা পায়নি। একে ইউনূসকে ফেরানোর চক্রান্ত বলাটা টুর্কের প্রকাশ্য মানবাধিকার অবস্থানকে রাজনৈতিক থ্রিলারে বদলে দেয়। 

শোয়েব চৌধুরী কি ওয়াশিংটনের ভেতরের খবর আদৌ জানেন?

জানেন না। তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের ব্রিফিংয়ের পাবলিক সারসংক্ষেপ নিয়ে নিজস্ব কাহিনি বুনেছেন। তার দীর্ঘ রেকর্ড আছে গুজব ছড়ানোর জন্য। ফ্যাক্টচেকার ও আদালতের নথিতে প্রতারণা, ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদনের অভিযোগ আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ফ্যাক্টচেক ইউনিটও তার লেখা ভিত্তিহীন বলেছে। এমন ব্যক্তির ‘আমেরিকা এখন যা ভাবছে’ বলাটা সূত্র নয়, অনুমান।

যুক্তরাষ্ট্র যদি হাসিনাকে ফেরাতে চাইত, তারা ‘কোনো অবস্থান নেই’ বলে চুপ থাকত না। তারা দ্বিপক্ষীয় চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা প্রকাশ্য শর্ত দিত। এখন তারা যা করছে তা হলো—নির্বাচিত সরকারকে স্বীকৃতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাম না নেওয়া, হাসিনা ইস্যু ঢাকা-দিল্লির ঘরে রাখা।

নাটকীয়তা চাইলে সব নীরবতাকে চক্রান্ত বলা যায়। কূটনীতি পড়তে চাইলে ব্রিফিংয়ের পুরো বাক্য পড়তে হয়, শুধু যে অংশটা থ্রিলার বানায় সেটা নয়। সালাহ উদ্দীন শোয়েব চৌধুরী একটু বেশি চালাক হয়ে গেছেন, ইউটিউব ভিউজের জন্য হাসিনা, আইএস, আল কায়েদা ও মার্কিন ইস্যু বেছে নিয়েছেন। ভিউ বাণিজ্যের ভিন্ন নিশ! 

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team