পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তায় সরকারের নতুন উদ্যোগ

0


পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তায় সরকারের নতুন উদ্যোগ

পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, ভূমি বিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো জটিল বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার উচ্চপর্যায়ের তিনটি কমিটি গঠন করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারিকৃত পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত এসব কমিটির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সরকারের এ উদ্যোগের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে শুধু নিরাপত্তা কিংবা শুধু উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে নিরাপত্তা, ভূমি, প্রশাসন, উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক—এই তিন স্তরের কমিটি গঠনের ফলে নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত গ্রহণের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হয়ে আসছে। পাহাড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের কারণে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। জেএসএস (সন্তু) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত)-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পারস্পরিক বিরোধও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠে এসেছে। এর ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় নতুন কমিটিগুলো সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পাহাড়ে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত কর্মকৌশল প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে প্রচলিত আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত এবং বিদ্যমান বিধি-বিধান পর্যালোচনার সুযোগ থাকায় দীর্ঘদিনের নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতাগুলোও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরামর্শক কমিটিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত কাঠামো, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামত বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সার্বিকভাবে, সরকারের এ উদ্যোগকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা না করে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতির আওতায় আনার প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ, নিরপেক্ষভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধান, উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল নিশ্চিতকরণ এবং সব সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে এগোতে পারলে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team