কিশোর গ্যাং অপ্রতিরোধ্য: ১৫ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়াবহ উত্তরাধিকার।

0

কিশোর গ্যাং অপ্রতিরোধ্য: ১৫ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়াবহ উত্তরাধিকার।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন আর শুধু ঢাকার কয়েকটি মহল্লার সমস্যা নয়। রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরেও কিশোর-তরুণদের সংঘবদ্ধ অপরাধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনা সামনে আসছে। কুমিল্লার সাম্প্রতিক অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সেই বাস্তবতারই ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী একজন এবং দুই কিশোরসহ একাধিকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অপ্রতিম হত্যার ভয়াবহতা শুধু একটি শিশুর নির্মম মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। তদন্তে উঠে এসেছে, সে একা নয়, বরং বয়সে বড় একদল তরুণের সঙ্গে চলাফেরা করছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় তাকে মাথায় আঘাত করা হয়। পরবর্তী অনুসন্ধানে পাঁচ হাজার টাকা দেনা, অসম বয়সী বন্ধুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির মতো আরও কিছু বিষয়ও সামনে এসেছে। অর্থাৎ একটি অপরাধের পেছনে শুধু লোভ নয়, রয়েছে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ যেখানে কিশোরদের সঙ্গে অপরাধপ্রবণ তরুণদের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।

এই প্রবণতাকে শুধু ‘বখে যাওয়া কিশোর’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে মূল সংকটটি ধরা পড়বে না। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি এবং পেশিশক্তির ব্যবহার নিয়ে বহু অভিযোগ ও অনুসন্ধান হয়েছে। ঢাকায় পুলিশ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের যোগাযোগের অভিযোগও উঠে এসেছে। এর ফলে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—যেখানে অপরাধী হওয়ার আগে কিশোর শিখছে ক্ষমতার ছায়ায় কীভাবে ভয় দেখাতে হয়।

তবে এটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সমস্যা হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো, পরিবারে নজরদারির ঘাটতি, মাদক, বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং স্থানীয় আধিপত্যের সংস্কৃতি—সবকিছু মিলেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পরিবেশ তৈরি করে। কুমিল্লায় চলতি বছরই মাদক ও এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, রাজনৈতিক পালাবদল হলেও যদি পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি বদলে না যায়, তাহলে গ্যাংয়ের কাঠামোও সহজে ভাঙবে না। আশ্রয়দাতা বদলাতে পারে, কিন্তু অপরাধের মডেল থেকে যেতে পারে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হত্যার ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—যে সমাজ কিশোরের হাতে অপরাধের অস্ত্র তুলে দেয়, সেই সমাজ কি শুধু কিশোরকে শাস্তি দিয়ে নিরাপদ হতে পারে? উত্তর খুঁজতে হলে কিশোরের পাশাপাশি তার পেছনের ‘বড় ভাই’, অর্থের উৎস, অস্ত্রের জোগান এবং যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ককেও আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে অপ্রতিমের মতো আরও কোনো শিশুর জীবনই হয়ে উঠতে পারে এই সংস্কৃতির পরবর্তী নির্মম পরিণতি।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team