ভারতের হাতে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব? আওয়ামী লীগ আমলের নীতির ফাঁকফোকর নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের ডিজিটাল নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দেশের ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক ডেটা যোগাযোগের বড় একটি অংশ কেন ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল?
গত এক দশকে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ ব্যবহার কয়েক ডজন গুণ বেড়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সাবমেরিন ক্যাবল সক্ষমতা গড়ে না ওঠায় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হয়েছে ভারতের সঙ্গে যুক্ত ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল বা আইটিসির মাধ্যমে। খাতসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এই ব্যান্ডউইথ আমদানিতে বাংলাদেশ থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ভারতে গেছে।
এখানেই আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হলেও আন্তর্জাতিক ডেটা সংযোগে পর্যাপ্ত বিকল্প ও নিজস্ব সক্ষমতা কি সময়মতো তৈরি করা হয়েছিল?
দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ যখন ক্রমবর্ধমান ডেটা চাহিদার মুখে পড়ে, তখন ভারতের স্থলভাগের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। সমালোচকদের প্রশ্ন—এটি কি আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনার দুর্বলতা, নাকি একটি বড় নীতিগত ফাঁকফোকর?
প্রযুক্তিগত দিক থেকে উদ্বেগের আরেকটি কারণ ভারতের নিজস্ব আইন।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ধারা ৬৯ এবং টেলিকমিউনিকেশন অ্যাক্ট, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আইনগত পরিস্থিতিতে ভারত সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন টেলিযোগাযোগ ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কের তথ্য নজরদারি, আটক বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রতিটি ডেটা বা প্রতিটি যোগাযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পড়ছে। কিন্তু ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে আন্তর্জাতিক ডেটা চলাচল করলে আইনগত এখতিয়ার, মেটাডেটা পর্যবেক্ষণ এবং নেটওয়ার্ক-নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকির প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও ডিজিটাল সংযোগ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করা হলেও সমালোচকদের প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমান্তরাল সুরক্ষা ব্যবস্থা কেন যথেষ্ট দ্রুত গড়ে ওঠেনি?
একটি রাষ্ট্র যখন একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন ঝুঁকি শুধু গোয়েন্দা নজরদারির নয়।
রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সংকটে সংযোগ বিঘ্নিত হলে ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, রপ্তানি খাত এবং সাধারণ ইন্টারনেট সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে ‘কিল সুইচ’ হিসেবে ভারত যেকোনো সময় বাংলাদেশের ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারবে—এমন না। কারণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগে একাধিক রুট ও নেটওয়ার্ক রয়েছে। কিন্তু একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিজেই একটি কৌশলগত দুর্বলতা—
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়েও কেন আন্তর্জাতিক ডেটা অবকাঠামোয় যথেষ্ট বহুমুখীকরণ করেনি?
কেন নতুন সাবমেরিন ক্যাবল ও বিকল্প আন্তর্জাতিক রুট তৈরির পরিকল্পনা চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়নি?
কেন দেশের ক্রমবর্ধমান ডেটা চাহিদা পূরণে ভারতীয় স্থলভিত্তিক সংযোগের ওপর নির্ভরতা বাড়তে দেওয়া হলো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন।
কারণ ডিজিটাল যুগে সার্বভৌমত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষা দিয়ে নিশ্চিত হয় না।
ডেটার পথও একটি দেশের কৌশলগত সীমান্ত।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নীতিতে তাই প্রয়োজন—
— নতুন ও বহুমুখী সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ
— বিকল্প আন্তর্জাতিক ডেটা রুট
— শক্তিশালী জাতীয় ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ
— সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বাধ্যতামূলক এনক্রিপশন
— এবং আন্তর্জাতিক সংযোগে একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
আর সেই প্রশ্নের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের ডিজিটাল অবকাঠামো ও নীতিগত সিদ্ধান্তের একটি নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক জবাবদিহি ও তদন্ত এখন জরুরি।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment