নিপীড়ন থেকে গণজাগরণ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের সংহতি ও সক্রিয়তা

0

এই প্রবন্ধে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেখানো হয়েছে, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন কীভাবে প্রতিবাদ দমনের পরিবর্তে উল্টো গণজাগরণের জন্ম দেয়। লেখকের মূল যুক্তি হলো, দীর্ঘদিনের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বাচনী কারচুপি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন, অর্থনৈতিক দুর্নীতি এবং বিচার বিভাগের রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে জনগণের মধ্যে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, জুলাই মাসের নৃশংস দমন-পীড়ন সেই ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। আবু সাঈদ, শেখ আশহাবুল ইয়ামিন, শিশু আহাদ, সাফকাত, নাফিসা ও নাইমার মতো নিরস্ত্র বা নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু সাধারণ মানুষের মনে গভীর ‘নৈতিক অভিঘাত’ সৃষ্টি করে। এই অভিঘাত ভয়কে অতিক্রম করে ক্ষোভ, শোক এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে। ফলে কোটা সংস্কারের সীমিত দাবি দ্রুত স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সর্বজনীন আন্দোলনে রূপ নেয়। প্রবন্ধে আরও দেখানো হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দৃশ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নারী, শ্রমিক, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের এক অভিন্ন নৈতিক সম্প্রদায়ে যুক্ত করে। এই সংহতি আন্দোলনকারীদের যৌথ পরিচয়কে শক্তিশালী করে এবং প্রতিবাদকে নৈতিক দায়িত্বে রূপান্তরিত করে। লেখক ‘দমন-পীড়ন-থেকে-গণজাগরণ’ কাঠামোর মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে নৈতিক অভিঘাত, আবেগগত সংহতি, যৌথ পরিচয় এবং অন্যায়-বোধের কাঠামো একসঙ্গে কাজ করে পাল্টা গণজাগরণ সৃষ্টি করে। তাই জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, স্বৈরাচারী শাসনের চরম দমন-পীড়ন অনেক সময় জনগণকে নীরব না করে বরং ঐতিহাসিক প্রতিরোধে সংগঠিত করে।

ভূমিকা

তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যেও কেন আন্দোলনকারীরা নিজেদের জীবন ও অঙ্গহানির ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক সক্রিয়তায় অংশ নেন? স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মিছিলে যোগ দিতে মানুষকে আসলে কোন জিনিসটি উৎসাহিত করে? দমন–পীড়ন যাঁরা করেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব ও আলোচিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। ক্রিশ্চিয়ান ডেভেনপোর্ট (২০০৫, ১২২)-এর মতে, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন হলো ‘নাগরিকদের ওপর কর্তৃপক্ষের এমন কিছু পদক্ষেপ বা নেতিবাচক নিষেধাজ্ঞা, যা তাদের আচরণ ও বিশ্বাসকে সীমিত করে (যেমন: সান্ধ্য আইন জারি করা, গণগ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা)। অথবা ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিসর ভঙ্গ করে শারীরিকভাবে ক্ষতিসাধন কিংবা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া (যেমন: নির্যাতন, গুম ও গণহত্যা)।’ অনেকে যুক্তি দেন, এ ধরনের নিপীড়ন প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয় এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে (ইলেফসেন ২০১৬; উড ২০০৭)। তবে আরেক দল গবেষকের মতে, নিপীড়নের প্রভাবটি একটি বক্ররেখার মতো: শুরুর দিকে দমন-পীড়ন রাজনৈতিক তৎপরতাকে কিছুটা থামিয়ে দিলেও পরবর্তী সময়ে তা উল্টো প্রতিরোধের জন্ম দেয়, কিংবা আন্দোলনকারীদের কৌশল বদলে অন্য পথে হাঁটার রসদ জোগায় (ব্রকেট ২০০৫; ফ্রান্সিসকো ১৯৯৬ক; মুর ১৯৯৮; ও'ব্রায়েন ও দেং ২০১৫)। অন্যদিকে টেড রবার্ট গারের ‘আপেক্ষিক বঞ্চনা’ তত্ত্বের (১৯৭০) আলোকে বলা যায়, মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, তাদের ক্ষোভও তত দানা বাঁধে। আর এই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত রাগ, সহিংসতা ও আবেগজনিত গণজাগরণের জন্ম দিতে পারে।

যদিও বিদ্যমান গবেষণাগুলো সামাজিক আন্দোলন এবং সামগ্রিক গণজাগরণের ওপর দমন-পীড়নের প্রভাব সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা দেয়, তবুও চরম সহিংসতার মুখে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং এর বহুমুখী প্রভাবের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এগুলো এখনো বেশ সীমিত (আলমেডা ২০০৮; হনারি ২০১৮; ম্যাকএডাম ১৯৯০)। ক্রিশ্চিয়ান ডেভেনপোর্ট (২০০৭), মলি ইনম্যান (২০১২) এবং হ্যাংক জন্সটন (২০১২) এসব সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে নতুন ধরনের বিশ্লেষণের ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে দেখানো হয় কীভাবে দমন-পীড়ন প্রতিবাদকে থামিয়ে দেওয়ার বদলে উল্টো ত্বরান্বিত বা উসকে দিতে পারে।

২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একটি উদাহরণ হিসেবে নিয়ে এই প্রবন্ধে দমন-পীড়ন থেকে কীভাবে গণজাগরণ তৈরি হয়, তার একটি রূপরেখা উপস্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যমান গবেষণার ঘাটতিগুলো পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের কঠোর নিপীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা কেন প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন, সেই কারণগুলোও অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।

আমার মূল যুক্তি হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণঘাতী গুলি দিয়ে নির্বিচার হত্যা, রাবার বুলেটে চোখ অন্ধ করে দেওয়া কিংবা হাঁটুতে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো যে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তা জনগণের মনে গভীর আবেগ, সংহতি ও একাত্মবোধ জাগিয়ে তুলেছিল। এর ফলেই মূলত প্রচণ্ড পাল্টা-গণজাগরণের (ব্যাকল্যাশ মোবিলাইজেশন) জন্ম হয়; যেখানে তৎকালীন নিপীড়ক সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সচেতন আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সাধারণ পথচারী ও দর্শকেরাও সক্রিয় প্রতিবাদে রূপ নেন।

চিত্র ১: দমন–পীড়ন থেকে গণজাগরণ
চিত্র ১: দমন–পীড়ন থেকে গণজাগরণ

আমার মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন এবং বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর ফলে জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভ জমা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত এই অভ্যুত্থানকে নৈতিক ভিত্তি দিয়েছিল। চব্বিশের জুলাই মাসে চরম দমন–পীড়ন ও সহিংসতা এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছিল। এটি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আবেগ ও নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে এবং ভুক্তভোগী বা ভিকটিমদের অভিন্ন পরিচয়ে একসূত্রে বেঁধে ফেলে।

চিত্র ১-এ দমন-পীড়ন থেকে কীভাবে পাল্টা গণজাগরণের বিকাশ ঘটেছে, তা দেখানো হয়েছে। তবে এই বিকাশ কোনো সরলরৈখিক পথে ঘটেনি; আন্দোলনকারীদের নিজস্ব প্রেক্ষাপট, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতার ভিত্তিতে প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার কারণ ও তাৎক্ষণিক প্রভাবকগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম ছিল।

পরবর্তী অংশে, আমি অভ্যুত্থানের আগের পুঞ্জীভূত ক্ষোভগুলো সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করেছি। এরপর আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দমন-পীড়ন থেকে পাল্টা গণজাগরণের দিকে যাওয়ার প্রস্তাবিত রূপরেখাটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যগুলো সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও লেখকের নেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্দোলনকারীদের মাঠে নামার অনুপ্রেরণার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন। এটা জনগণের মধে৵ প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল এবং বিক্ষোভে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিল। এই ভয়াবহ নিপীড়ন সাধারণ পথচারী ও দর্শকদের মনে একধরনের নৈতিক ও আবেগময় প্রতিক্রিয়া জন্ম দিয়েছিল; যা শেষ পর্যন্ত আরও বেশি মানুষকে মাথা নোয়ানোর বদলে এই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসতে চালিত করেছিল।

পূর্ব-বিদ্যমান ক্ষোভ: বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদি শাসনামলে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, বারবার নির্বাচনে কারচুপি এবং ভিন্নমত দমনের এক নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর পটভূমিতেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণবিস্ফোরণ ঘটে। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই ক্ষোভ জনগণের মনে যেমন এক নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তেমনই তৈরি করেছিল এক রাজনৈতিক সুযোগ। এটা শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পোশাকশ্রমিক, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীসহ (যারা কোটা সংস্কারের সঙ্গে আগে কোনো সরাসরি স্বার্থ জড়িত ছিল না) সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই গণবিক্ষোভে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

হাসিনা সরকারের আমলের নিপীড়ন ছিল বহুমুখী—গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ (২০২১)-এর তথ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে ৮৬টির বেশি গুমের ঘটনা তারা যাচাই করে নিশ্চিত করেছে; যদিও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারণা, হাসিনা আমলে গুমের শিকার হয়েছেন ৬০০ জনের বেশি মানুষ। এ ছাড়া ২০০৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে ২ হাজার ৭৫৭টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২১)।

শেখ হাসিনা সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনই আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলো ছিল নির্বাচন বর্জন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরাসরি ভোট কারচুপিতে কলঙ্কিত। এসবের অনেক ধরনের চিত্র সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং তৎকালীন ভিডিওতে ধরা পড়ে (বিবিসি ২০২৪)। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ষাটের বেশি গণতন্ত্রকামী দল ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করায় ভোটারদের উপস্থিতি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এই বর্জন এবং এর ফলে নামমাত্র উপস্থিতি কার্যত শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অবাধ নির্বাচনের দাবির পক্ষেই একধরনের অঘোষিত গণভোট গঠন করে।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র সূচকগুলো থেকেও এই গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। দ৵ ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের ‘ডেমোক্রেসি রিপোর্ট’ (২০২৪)-এ উদারনৈতিক ও নির্বাচনী গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশকে বড় ধরনের অবনমনের তালিকায় রাখা হয়; অন্যদিকে ‘বারটেলসম্যান ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’ (বারটেলসম্যান স্টিফটুং ২০২৪) দেশকে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারী শাসন হিসেবে চিহ্নিত করে। ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার জন্য দায়ী বা সহযোগীদের’ বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ভিসা বিধিনিষেধের নীতিগত পদক্ষেপগুলোও (মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর  ২০২৩) হাসিনা সরকারের গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে।

তিনবারের কারচুপির নির্বাচন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা একেবারেই নিঃশেষ করে দিয়েছিল। যখন প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখন গণবিক্ষোভই মানুষের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় পথ হিসেবে দেখা দেয় (ট্যারো ১৯৯৪)। নাগরিকদের, বিশেষত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আস্থাবান ভোটারদের কাছে অভ্যুত্থান ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের শেষ আশ্রয়স্থল।

বাক্স্বাধীনতার ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের ইতিহাস ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা মানহানির মামলা, বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তোপ এবং শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। ‘ডয়চে ভেলে’ (২০২৩) এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘আয়নাঘর’ নামের বন্দিশালাগুলোতে চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র উঠে আসে; যেখানে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তিদের আটকে রাখা হতো, শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো এবং আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এই আঘাত একাধারে আন্দোলন দমনের কাজ করেছিল, অন্যদিকে জনগণের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে আরও গভীর করেছিল। মানুষ যখন দেখে যে তাদের কণ্ঠ, এমনকি তারা শারীরিকভাবেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে একধরনের মানসিক বঞ্চনা ও নৈতিক ক্ষত তৈরি হয় (স্ক্যারি ১৯৮৫)। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ক্ষোভ ও আঘাত জমা হতে হতে এমন এক প্রতিবাদী নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে, যেখানে আর ভয় দেখিয়ে নীরব রাখা যায় না; বরং প্রতিবাদই হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার (স্কট ১৯৭৬)।

প্রকাশ্য রাজনৈতিক নিপীড়নের বাইরে হাসিনা সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলোও জনমনে ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান তলানিতে নিয়ে ঠেকায়; তা ছাড়া বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতের চুক্তিগুলো দেওয়া হয়েছিল শাসকগোষ্ঠী-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোকে, যা করদাতাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয় (টিআইবি ২০২৩)। ব্যাংকিং খাত পরিণত হয়েছিল ঘনিষ্ঠ দোসরদের সুবিধা দেওয়ার এক সুবিধাভোগী নেটওয়ার্কে; অন্যদিকে দুর্নীতি ও ঘুষের কারণে মেগা-অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর খরচ আকাশচুম্বী হয়েছিল (অনামা ২০২৪)। যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর একটি তথ্যচিত্রে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয় (অনামা ২০২৫)।

এই অর্থনৈতিক ক্ষোভগুলো ‘আপেক্ষিক বঞ্চনা’ তত্ত্বের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল: পণ্য ও সুযোগ-সুবিধা যত অপ্রতুল হতে থাকে, অন্যায়ের অনুভূতিও তত তীব্র হতে থাকে (গার ১৯৭০)। ২০২৪ সালের মধ্যে, দেশের এক বড় মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমবর্ধমান খরচ ও চাকরির অনিশ্চয়তার চাপে পিষ্ট হয়ে পড়ে। এই নাগরিকদের কাছে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করা ছিল একই সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক হতাশা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এটা ছিল এই দুর্নীতিগ্রস্ত অচলাবস্থা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

বিচার বিভাগে পরিকল্পিতভাবে শাসক দলের অনুগতদের বসানো হয়েছিল। মিথ্যা মামলা এবং জামিন প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী, মানবাধিকারকর্মী এবং ছাত্রনেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মতো অস্পষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত আন্দোলনকারীদের আদালতগুলো নিয়মিতভাবে জামিন প্রত্যাখ্যান করত; যা কার্যত বিনা বিচারে ভিন্নমত পোষণকারীদের কারাগারে আটকে রাখার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। বিচার বিভাগের ওপর এই দলীয় নিয়ন্ত্রণ ন্যায়বিচার পাওয়ার সব প্রাতিষ্ঠানিক পথ বন্ধ করে দিয়েছিল; যা আন্দোলনকারীদের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে কেবল গণজাগরণের মাধ্যমেই সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। যেমনটি জেন ম্যানসব্রিজ ও ম্যাথিউ ডি ম্যাককিউবিনস (১৯৯৩) উল্লেখ করেছেন, যখন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন নাগরিকেরা বিচার পাওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরের পথগুলো বেছে নেয়। বাংলাদেশেও এই আইনি বা বিচারিক নিপীড়ন রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে একটি ঝুঁকির কাজ থেকে একটি নৈতিক দায়িত্বে রূপান্তর করতে সাহায্য করেছিল, বিশেষত আদালত যখন পুলিশের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড তদন্ত করতে কিংবা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

সামগ্রিকভাবে, পূর্ব-বিদ্যমান এসব ক্ষোভই মূলত জুলাইয়ের গণ-বিস্ফোরণের উর্বর ভূমি হিসেবে কাজ করেছিল। রাজনৈতিক সংহতির তত্ত্বগুলোয় জোর দিয়ে বলা হয় যে আন্দোলন বা অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একেক মানুষের সহনশীলতার মাত্রা (থ্রেশহোল্ড) একেক রকম হয়—যা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগ এবং ঝুঁকির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে (গ্র্যানোভেটার ১৯৭৮; ম্যাকঅ্যাডাম ১৯৮৬)। বাংলাদেশে এই সহনশীলতার মাত্রা ধীরে ধীরে কমে এসেছিল: প্রথমে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক কষ্টের মাধ্যমে, এরপর বারবার নির্বাচনী প্রতারণার কারণে এবং অবশেষে ভিন্নমত প্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত আশঙ্কায়।

সহিংসতার এসব রূপ এক ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। জেসপার (২০১১) একে বলেছিলেন ধ্রুপদি ‘মোরাল  শক’ বা নৈতিক ধাক্কা। ভুক্তভোগীদের পরিবার এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁদের এই স্বজন হারানোর বেদনাকে কেবল ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে নয়, বরং এক সম্মিলিত ট্র্যাজেডি হিসেবে লালন করেছিলেন। এটা তাঁদের বঞ্চনার বোধকে বহু গুণে বাড়িয়ে দেয় এবং জবাবদিহির দাবিকে তীব্র করে তোলে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এসব ঘটনা আন্দোলনকারী এবং সাধারণ দর্শক—সবাইকে একসূত্রে গেঁথেছিল, যেখানে প্রতিবাদ কেবল একটি বিকল্প রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং পরিণত হয়েছিল এক অনিবার্য নৈতিক দায়িত্বে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর ২০২৪) একটি সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন প্রাণ হারান এবং হাজার হাজার মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন, যার মধ্যে নিহতদের অন্তত ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত টানা হয় যে, ‘নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং শাসক দলের ক্যাডাররা রাজনৈতিক নেতাদের জ্ঞান, সমন্বয় ও সরাসরি নির্দেশনায় পরিকল্পিতভাবে মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে’ (ওএইচসিএইচআর ২০২৪, ৫)। বিশেষ করে, ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের দমন-পীড়ন যখন অভূতপূর্ব সহিংসতার রূপ নেয়, তখন আগের সব জমাটবদ্ধ ক্ষোভ এক মহা-নৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নেয়। এই ঘটনা এতটাই গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল যে তা নিরপেক্ষ সাধারণ পথচারীদেরও রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য করেছিল। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করে কীভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচনে অনিয়ম, বাক্‌স্বাধীনতা হরণ এবং শাসনের ব্যর্থতাগুলো পুঞ্জীভূত হতে হতে এক পর্যায়ে চরম গণবিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

অর্থাৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা কেবল তৎকালীন রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কারণেই রাজপথে নামেননি, বরং হাসিনা সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসনের ভোগান্তিও ছিল এর নেপথ্য চালিকা শক্তি। এবার আমি ব্যাখ্যার চেষ্টা করব, কীভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা যখন নৈতিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখন তা এক প্রচণ্ড পাল্টা গণজাগরণের (ব্যাকল্যাশ মোবিলাইজেশন) জন্ম দেয়। এই গণজাগরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং স্তরে স্তরে থাকা বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিকে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের এক অভিন্ন দাবির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও পাল্টা গণজাগরণ

তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ও সমর্থক ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ—ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী, প্রগতিশীল, ইসলামপন্থী কিংবা উদারপন্থী—জুলাই অভ্যুত্থানে একসূত্রে গেঁথে গিয়েছিল। সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের মানুষের এই অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ একটি অতি সাধারণ প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির করে: জীবন ও অঙ্গহানির ঝুঁকি জেনেও আন্দোলনকারীরা কেন এমন এক অভ্যুত্থানে যোগ দেন?

প্রতিবাদকারীদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কিশোর-কিশোরী, রিকশাচালক এবং নানা পেশার মানুষ ছিলেন; যাঁদের প্রাথমিক আন্দোলন—অর্থাৎ কোটা সংস্কার দাবির সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে কোনো সরাসরি স্বার্থ জড়িত ছিল না। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শাসক দলের অনুগত ক্যাডাররা যখন আন্দোলনকারীদের হত্যা ও গুরুতর আহত করতে শুরু করে, তখন বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কমার বদলে নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। নিপীড়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা এবং আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার এই ঘটনা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং গভীর একাডেমিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। দমন-পীড়নের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে গবেষকদের মনোযোগ এখন ‘দমন-পীড়নের প্রভাব’ থেকে সরিয়ে ‘দমন-পীড়নের প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া’ বোঝার দিকে দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতি ব্যক্তি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তি সেই নিপীড়নকে কীভাবে উপলব্ধি করছে তার ওপর (কার্জম্যান ১৯৯৬)। এখানে মানুষের ‘যৌক্তিক পছন্দ’ বা ‘র‍্যাশনাল চয়েস’ কাজ করতে পারে, অর্থাৎ তারা আন্দোলনে অংশগ্রহণের লাভ-ক্ষতি হিসাব করে এবং ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেয় (ক্ল্যান্ডারম্যানস ১৯৮৪)। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির অনুধাবন এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ভিন্ন হতে পারে। যদিও বিদ্যমান গবেষণাগুলোয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভূমিকা নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছে, তবে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে বিষয়ে আমরা খুব কমই জানতে পেরেছি (লিন্ডেন ও ক্ল্যান্ডারম্যানস ২০০৬; মস ২০১৪–এ)। দমন-পীড়ন এবং এর বিপরীতে গণজাগরণের গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য নিপীড়নের মুখে মানুষের নেওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও তাদের পছন্দের জায়গাগুলোকে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীর রাজপথে নামার সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র সাঈদকে পুলিশ লক্ষ্য করে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর ভিডিও ফুটেজ প্রথমে টেলিভিশন চ্যানেলে এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম হত্যাকাণ্ড, যা আইকনে পরিণত হয়েছিল। এই ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরামসহ তিনজনকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা হত্যা করে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এসব ভয়াবহ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় খুলনার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলেন: 

আমি আন্দোলন সমর্থন করতাম, কিন্তু শুরুর দিকে সরাসরি অংশ নেওয়ার তীব্র প্রয়োজন অনুভব করিনি। যতক্ষণ না আবু সাঈদকে হত্যা করা হলো। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে কোটা নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা দ্বিতীয় ধাপে চলে গেল। আমি তখন মূলত ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম, কারণ আমারই এক ভাই বুলেটের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল, যেন রক্ত ঝরা ওই দেহটি আমার নিজেরই! ১

শিক্ষার্থীদের হত্যা ও হামলার খবর চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনবহির্ভূত সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। পাশাপাশি গণসমর্থন যত বাড়তে থাকে, আন্দোলনে অংশগ্রহণের পক্ষে একটি সামাজিক আদর্শ বা সর্বজনীন রীতি (সোশ্যাল নরম) তৈরি হতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সক্রিয়তা যখন প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ বা আদর্শের সমর্থন পায়, তখন যাদের শহীদ বা বীর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাদের আত্মত্যাগ পুরো গণ–আন্দোলনকে তীব্র ও গতিশীল করে তোলে (লিন্ডেন ও ক্ল্যান্ডারম্যানস ২০০৬)। বিশেষ করে যে সমাজগুলোতে নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে সম্মান জানানো ও বন্দনা করা হয়, সেখানে এই গতিশীলতা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের শেষের দিকে ইতালি ও জার্মানির ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো দেখায় যে প্রচণ্ড রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে নির্দিষ্ট কিছু সংগঠন আরও বেশি আমূল বা চরমপন্থা গ্রহণ করেছিল এবং দমন-পীড়ন ঠেকিয়ে টিকে থাকার জন্য নিজেদের পুনর্গঠিত করেছিল (দেল্লা পোর্তা ১৯৯৫)।

এই যুক্তির ধারাবাহিকতায়, জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন কীভাবে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা এবং আন্দোলনের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল, তা একজন শিক্ষার্থীর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:

আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন তা কেবল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং আমি কোনোভাবেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু যখন আবু সাঈদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্তৃক ছাত্রীদের নির্মমভাবে পেটানোর দৃশ্য দেখলাম, তখন তা আমার ভেতর প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দেয়।২

রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত ক্যাডাররা বিক্ষোভ দমন করতে মারমুখী ও বেপরোয়া সহিংসতার পথ বেছে নেয়। তাজা গুলি, টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, শটগানের ছররা গুলি এবং রামদার নির্বিচার ব্যবহার সত্ত্বেও পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের যৌথ শক্তি প্রতিবাদকারীদের স্তব্ধ করতে পারেনি। হেলিকপ্টার থেকেও জনতাকে লক্ষ্য করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। সরকার ইন্টারনেট ও যাবতীয় টেলিযোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেশকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এবং দেখামাত্র গুলির (শুট-অন-সাইট) আদেশ দিয়ে কারফিউ জারি করে। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) একজন স্নাতক শিক্ষার্থী জানান, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এই তীব্রতা কীভাবে তাঁকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং রাজপথে নামতে বাধ্য করেছিল:

পুলিশ সদস্যরা জনতার ওপর রাবার বুলেট ছুড়তে শুরু করে। আমাদের চারপাশে ছিল সাঁজোয়া যান (এপিসি)। এরপর হঠাৎ করে একটি সামরিক ট্যাংক দৃশ্যপটে হাজির হয়ে রাস্তাজুড়ে এগিয়ে আসতে থাকে এবং নির্বিচার গুলি চালাতে শুরু করে। এত কাছ থেকে জীবনে প্রথমবার আমি কোনো ট্যাংক দেখেছিলাম। সেই চরম সহিংসতা এবং মানবজীবনের প্রতি এমন তাচ্ছিল্য আমাকে ভেতর থেকে এক গভীর ধাক্কা দেয়। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি বুলেট ঠিক আমার পাশ কেটে চলে যায়। সে বুলেট মাত্র কয়েক মিটার পেছনে থাকা এক যুবতীকে আঘাত করে, যাঁর সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত আগেই আমার কথা হয়েছিল। অন্য আন্দোলনকারীরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়; তিনি বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন। তবে আরেকজন আন্দোলনকারী ততটা ভাগ্যবান ছিলেন না। পুলিশের একটি গুলি সরাসরি তাঁর চোখে এসে লাগে; তিনি আর বাঁচেননি। (তাবাসসুম ২০২৫)

মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী শেখ আশহাবুল ইয়ামিনের হত্যাকাণ্ডটি শাসক দলের অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর দুঃসাহস ও নির্মমতার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ১৮ জুলাই ঢাকার অদূরে সাভারের একটি বাসস্ট্যান্ডের কাছে ছররা গুলিতে ইয়ামিন মারাত্মকভাবে আহত হন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইয়ামিন হত্যার তিনটি ভিডিও যাচাই ও নিশ্চিত করেছে (অ্যামনেস্টি ২০২৪)। পুলিশ তাঁকে প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা না দিয়ে তাঁর অচেতন দেহ একটি সাঁজোয়া যানের (এপিসি) ওপর রেখে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখা যায়, এক পুলিশ কর্মকর্তা ইয়ামিনকে দুই হাত ধরে তোলার চেষ্টা করছেন, আর অন্য কর্মকর্তা তাঁর পা ধরে জোরপূর্বক যানটি থেকে টেনে নিচে ফেলে দিচ্ছেন—যার ফলে ইয়ামিনের মাথা সরাসরি গিয়ে রাস্তার পিচে আঘাত করে। তৃতীয় ভিডিওতে সম্পূর্ণ দাঙ্গানিরোধী পোশাকে সজ্জিত দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে এপিসি থেকে নেমে নিচে পড়ে থাকা ইয়ামিনের দেহের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর তারা তাঁর দেহটি টেনে সড়ক বিভাজকের (মেডিয়ান ব্যারিয়ার) ওপর দিয়ে ওপারে নিয়ে ফেলে রাখে। সেই দিনই আঘাতের তীব্রতায় ইয়ামিন মারা যান।

ইয়ামিনের এই ভিডিও এবং একই ধরনের ভয়াবহ নির্যাতনের দৃশ্যগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর তা সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ না করে বরং আরও বেশি আন্দোলনে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর প্রতিক্রিয়া ছিল দমে যাওয়া নয়, বরং নির্যাতনের ভয়কে জয় করা:

...নিজেদের রক্ষায় আন্দোলনকারীরা কাছের গাছ থেকে ডালপালা ভেঙে নিচ্ছিল...আমরা মিরপুর রোডে পৌঁছানোর আগেই লালমাটিয়া থেকে ধারালো অস্ত্র হাতে ছাত্রলীগের একটি বিশাল দল ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডে রাপা প্লাজার পাশের একটি ভবনের সামনে আমি হলি ক্রস কলেজের কিছু ছাত্রীকে দেখতে পাই...টিয়ার শেলের কারণে তাদের অনেকেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিল...আমরা যা দেখেছিলাম তা ছিল এক ধ্বংসস্তূপ: জ্বলন্ত টায়ার, রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিত্যক্ত জুতা, রক্তের দেয়াল আর তাজা মাংসের টুকরা। পুরো এলাকাটিকে যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র মনে হচ্ছিল! সেই বীভৎস দৃশ্য থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসাটাকে মনে হচ্ছিল এক দ্বিতীয় জীবন লাভ করা—মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরা, বিশৃঙ্খলার বুক থেকে শ্বাস ছিনিয়ে আনা! ক্লান্ত শরীর আর কাঁপতে থাকা মন নিয়েও আমরা জানতাম এটা শেষ নয়; আসল লড়াই তো কেবল শুরু হলো! (তাবাসসুম ২০২৫)

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থক, পোশাকশ্রমিক এবং খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরা এই প্রতিবাদে যোগ দিতে শুরু করেন। পরবর্তী অংশে আমি ব্যাখ্যা করব, কীভাবে এসব নির্মম নিপীড়নের ঘটনা ক্ষোভ ও শোকের এক অভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছিল, যেখানে অংশীদারত্বমূলক অনুভূতির জায়গা থেকে জন্ম নিয়েছিল সুদৃঢ় সংহতি এবং যা অবশেষে এক সফল পাল্টা গণজাগরণে (ব্যাকল্যাশ মোবিলাইজেশন) রূপ নেয়।

আবেগ, সংহতি ও পরিচয়ের রূপান্তর

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট মাসে নজিরবিহীন নিপীড়ন শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ‘মোরাল শক’ বা নৈতিক ধাক্কা দিয়েছিল, যা তাদের সরাসরি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চালিত করে। ‘মোরাল শক’ তত্ত্বের মূল বক্তব্য হচ্ছে, অন্যায় ও অবিচারের আকস্মিক আঘাত মানুষের ভেতরের ভয়কে ছাপিয়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা তাদের সম্মিলিত প্রতিবাদে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে (জেসপার ২০১১)। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণা করে বলেন:  

১৮ জুলাই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমাদের প্রধান ফটকের দুই পাশ থেকেই পুলিশ এবং তাদের সাথে থাকা সশস্ত্র ক্যাডাররা আমাদের ঘিরে রেখেছিল। তারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ছিল। আতঙ্কিত হয়ে আমরা সবাই ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে মূল ফটক বন্ধ করে দিই। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থামেনি, তারা ক্যাম্পাসের ভেতরের দিকেও নির্বিচার গুলি চালাতে থাকে। আমাদের অনেককে তড়িঘড়ি করে ক্যাম্পাসের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়, যা কিছুক্ষণের মধ্যেই আহতদের ভিড়ে ঠাঁইহীন হয়ে পড়ে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই তাণ্ডব চলে, এরপর অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তাদের ক্যাডাররা সবার ওপর হামলা চালায়। আমার গায়ে দুটি রাবার বুলেট লাগে। এক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করার সময় গুলি করা হয়। পরে আমি নিজে তাঁর নিথর দেহটি দেখেছি। (অনামা ২০২৫)

যদিও সাধারণত ধারণা করা হতো, ভীতি বা আতঙ্ক মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে (সিগেল ২০১১এ); তবে ভয় অনেক সময় উল্টো অংশগ্রহণের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। কারণ, মানুষ তখন পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং লঙ্ঘিত নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয় (আজাব ও সানতোরো ২০১৭)। আন্দোলনগুলো কৌশলগতভাবেই আত্মমর্যাদা, ক্ষোভ এবং সংহতির মতো আবেগগুলোকে কাজে লাগিয়ে স্থবিরতা কেটে বের হয়ে আসে এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে টিকে থাকে (জেসপার ২০১১; উড ২০০১)।

আরেকজন আন্দোলনকারী কীভাবে ক্ষোভ ও অসহায়ত্বে ভেঙে পড়েছিলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:

শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে তারা টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছিল। পুরো ক্যাম্পাস টিয়ার গ্যাসের গন্ধে ভরে গিয়েছিল। বিকেল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা হলপাড়া থেকে বেরিয়ে আসে। কিছু সাংবাদিক এবং একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের নিজেদেরই ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিল। অনেকের চোখেই জল ছিল; সবার মুখে উপচে পড়ছিল ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সেই মুহূর্তে আমি নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। (অনামা ২০২৫)

রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এই দৃশ্য প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করেছিল। সাধারণ নিরপেক্ষ মানুষদেরও কেবল নিজেদের জন্য নয়; বরং যারা সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাদের বিচার চেয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন (ওপ ১৯৯৪; ভ্যান স্টেকেলেনবার্গ ও ক্ল্যান্ডারম্যানস ২০১৩)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক নারী প্রতিবাদকারী তাঁর আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন:

আমার কোটা নিয়ে আমার কোনো কিছু বলার ছিল না। আমি মেয়েমানুষ, আমি এসএসসিতে ফেল করছি, এইচএসসি দিছি, টাইনাটুইনা পাস, আমার কোটা নিয়ে কিচ্ছু ছিল না। আমার কয়দিন পর বিয়ে হবে যাবে। আমি কোটা দিয়ে কী করমু? আমার এই যে ভাই-বোনগুলো মারা গেছে ভাই, ছোট ছোট বাচ্চা মারা গেছে, এই কষ্টে আমি আসছি। রাতে ঘুমাইতে পারি না। এই কষ্টে আসছি ভাই। আমাদের দাবি একটাই এখন। শেখ হাসিনার পদত্যাগ। (ডেইলি সান ২০২৫)

দমন-পীড়ন একটি আন্দোলনকে ভেঙে টুকরা টুকরা করে দেবে, এমন ধারণার বিপরীতে জুলাইতে দেখা যায় অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতি ও ঐক্যের ছবি। সামাজিক আন্দোলনবিষয়ক গবেষণাগুলো নির্দেশ করে যে সম্মিলিত যন্ত্রণা ও কষ্ট মানুষের মধ্যে শ্রেণি, লিঙ্গ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন পেরিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার সামাজিক মূলধন (সোশ্যাল ক্যাপিটাল) তৈরি করে (দেল্লা পোর্তা ১৯৯৫; পুটনাম ২০০০)। এই গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন—শিক্ষার্থী, তৈরি পোশাক শ্রমিক, গৃহিণী, মা, চিকিৎসক এবং নার্স হিসেবে তাঁরা রাজপথের আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি লজিস্টিক বা কৌশলগত সহায়তা জুগিয়েছিলেন।

এই অভ্যুত্থানে অন্তত ১১ জন নারী প্রাণ হারান (টিবিএস ২০২৪)। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৭ বছর বয়সী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়ার ক্ষেত্রে। আন্দোলন নিয়ে আলোচনার জন্য বন্ধুদের নিয়ে একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলেছিলেন নাফিসা এবং প্রতিদিন রাজপথে নেমেছিলেন। সাভার মডেল মসজিদ এলাকায় তাঁরা একটি বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করলে পুলিশ, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের ক্যাডাররা যৌথভাবে হামলা চালায়। পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছোড়ে। মিছিলের সামনের সারিতে থাকা নাফিসা গুলিবদ্ধ হন। তাঁকে প্রথমে ল্যাবজোন হাসপাতাল এবং পরবর্তী সময়ে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে পথেই প্রাণ হারান নাফিসা (অনামা ২০২৫)। তাঁর নিথর দেহ যখন বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মুক্তির মোড় এলাকায় তাঁর মামাদের ওপর আবার হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা; যেখানে তাঁর এক মামা পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হন। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত নাফিসার দেহ সাভারে তাঁর মামার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

অন্য আরেকটি ঘটনায়, উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নাইমা সুলতানা ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন (প্রথম আলো ২০২৪)। উত্তরার নিজ বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন তিনি আন্দোলন ও পুলিশের বর্বরতার দৃশ্য ধারণ করছিলেন, ঠিক তখন পুলিশ তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটি বুলেট তাঁর মাথার এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে (অনামা ২০২৫)। দুটি ঘটনাই অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা সাধারণ পথচারীদের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং আত্মত্যাগের এক অভিন্ন চেতনায় পুরো আন্দোলনকে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করে তোলে।

এসব ট্র্যাজেডি থেকে স্পষ্ট হয় কীভাবে একটি সম্মিলিত ট্রমা ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি ও পরিচয়ের মানুষদের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে (টারো ২০১১; ভ্যান স্টেকেলেনবার্গ ও ক্ল্যান্ডারম্যানস ২০১৩)। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বামপন্থী দল, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নেতা–কর্মীরা, যাঁরা অনেক সময় আত্মগোপনে থেকে কাজ করছিলেন, তারা পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে আন্দোলনকে এমন রূপ দেন। ফলে এটি কোনো নির্দিষ্ট দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক সর্বজনীন গণ–আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।

রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখোমুখি হওয়া মানুষের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক যৌথ পরিচয়ের জন্ম দিয়েছিল; যেখানে প্রত্যেকে নিজেকে একটি অভিন্ন ‘আমরা’ পরিবারের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব অনুযায়ী, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে একের সঙ্গে একের একাত্মতা যত বাড়ে, সম্মিলিত শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস ও মানসিক প্রস্তুতিও তত শক্তিশালী হয় (তাজফেল ও টার্নার ১৯৭৯)। এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:

আমি মাদ্রাসায় পড়ি। কিন্তু আমার ছোট ভাই স্কুলে পড়ে, আমার খালাতো-ফুফাতো ভাইয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওদের ওপর যখন গুলি চালানো হচ্ছে, তখন আমি কীভাবে ঘরে হাত গুটিয়ে বসে থাকি?৩

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের আত্মিক সম্পর্কের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন:

আমার চোখের সামনে একটি মেয়ে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ল, তাই তাকে ধরে তুলে মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যেতে হলো...এরপর যখন মেডিকেল সেন্টারে ফিরে এলাম, দেখলাম এক শিক্ষার্থীর চোখে গুলি লেগেছে, আরেকজনের কানের ভেতরে ঢুকে আছে রাবার বুলেট। এমনকি আহতদের বাঁচানোর জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সরবরাহও ফুরিয়ে আসছিল। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে বুলেটের আঘাতের চিহ্ন ছিল। (অনামা ২০২৫)

আন্দোলনের ফ্রেমিং—যেমন রাষ্ট্রীয় বর্বরতাকে তুলে ধরে ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুর চড়ানো’—এই যৌথ পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। এটি সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে জনগণের কাছে সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধকে ন্যায়সংগত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে (গ্যামসন, ফায়ারম্যান ও রাইটিনা ১৯৮২; মস ২০১৪বি)। আহ্‌ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এইউএসটি) এক শিক্ষার্থীর কথায় এর একটি চমৎকার সারকথা পাওয়া যায়:

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন আন্দোলনের দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে, তখন আমি এইউএসটিতে ছিলাম। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, আমরা তাঁদের ন্যায়বিচার চেয়েছিলাম...এটি ছিল এক কঠিন লড়াই, কিন্তু ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের এই অনড় অবস্থানই একদিন সত্যকে উন্মোচিত করবে। এই দেশ আমাদের। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এই দেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আমরা রাজপথে দাঁড়াব এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাব। (অনামা ২০২৫)

সামগ্রিকভাবে আবেগের এই আকস্মিক বিস্ফোরণ, মানবিক সংহতির শক্ত বন্ধন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের এই নতুন রূপান্তর—এই তিন বিষয়ই ব্যাখ্যা করে যে কেন জুলাই মাসে তীব্র দমন-পীড়ন চালিয়েও ভিন্নমতকে স্তব্ধ করা যায়নি; বরং তা এক ব্যাপক ও শেষ পর্যন্ত এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনকামী গণ–আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।

পাল্টা গণজাগরণ এবং সাধারণ পথচারীদের অংশগ্রহণ

পাল্টা গণজাগরণ (ব্যাকল্যাশ মোবিলাইজেশন) তখনই ঘটে, যখন রাষ্ট্রীয় নজিরবিহীন নৃশংসতা ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার বদলে উল্টো সাধারণ দর্শক-পথচারীদের প্রতিবাদীরূপে হাজির করে আন্দোলনের নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করে (অপ ১৯৯৪)। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিশুদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এই গতিশীলতাকে চরম মাত্রায় ত্বরান্বিত করেছিল। যাত্রাবাড়ীর নিজ বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা চার বছরের শিশু আহাদ চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে পরদিন সন্ধ্যায় মারা যায় (বালা ২০২৪)। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাফকাত সমীর—যার মা–বাবা সরকারের নির্দেশ মেনে তাকে ঘরেই রেখেছিলেন—ঘরের ভেতরে টিয়ার গ্যাস ঢোকা বন্ধ করতে জানালা আটকাতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারায় এবং একই হামলায় তার মামাও আহত হন (মাহমুদ ২০২৪)।

এ–জাতীয় ঘটনাগুলো গভীর নৈতিক ধাক্কা দিয়েছিল। এর ফলে মানুষ আকস্মিকভাবে চরম অবিচারের মুখোমুখি হয়। ফলে আন্দোলনে অংশগ্রহণের ঝুঁকি বা সহনশীলতার সীমা (থ্রেশহোল্ড) মুহূর্তেই কমে যায় এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ পরিবারগুলোকেও রাজপথে নামতে বাধ্য হয় (গ্র্যানোভেটার ১৯৭৮; জেসপার ২০১১)। একজন আন্দোলন সমন্বয়কের কথায় এই নৈতিক ধাক্কার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

আমি জানতাম, পেছানোর আর কোনো পথ নেই। আমরা আগেই চিহ্নিত হয়ে গেছি...আমরা অনেকের কাছ থেকে শুনেছি, যেহেতু আমাদের ভাইবোনেরা রক্ত দিচ্ছে, তাই নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে আমাদের আন্দোলন যোগ দেওয়া প্রয়োজন।৪

এ ধরনের ক্ষোভ এক শক্তিশালী সংহতিমূলক আবেগ হিসেবে কাজ করেছিল, যা ভীতিকে জয় করে আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল (জেসপার ২০১১; সিগেল ২০১১বি)। সাধারণ অনাত্মীয় পথচারীরাও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে রেহাই পাননি—যেমন ফজরের নামাজের পর হাঁটার জন্য বেরিয়ে গুলিতে নিহত হন শাহিনুর বেগম। নাতিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলির হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান মায়া ইসলাম (দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫বি)। এসব ঘটনা থেকে দেখা যায়, কীভাবে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি রাজপথে নামার ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশকে বদলে দেয় (গ্র্যানোভেটার ১৯৭৮; ভ্যান স্টেকেলেনবার্গ ও ক্ল্যান্ডারম্যানস ২০১৩)।

এসব প্রাণহানির পরদিন থেকে প্রতিবাদকারীদের উপস্থিতি বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এক শিক্ষার্থী সেদিনের স্মৃতিকথা তুলে ধরে বলেন:

সেদিনের পর, আমার পরিচিত রাজউকের প্রত্যেক শিক্ষার্থী আন্দোলনে নেমে পড়েছিল। আমরা দিনের পর দিন রাজপথে ফিরে এসেছি, নতুন নতুন মিছিল সংগঠিত করেছি...আমি প্রচার পাওয়ার জন্য কিংবা প্রশংসা কুড়ানোর জন্য আন্দোলনে যোগ দিইনি। এই আন্দোলন খ্যাতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য ছিল না; এটি ছিল সত্য ও ন্যায়বিচারের আন্দোলন। (তাবাসসুম ২০২৫)

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টত বোঝা যায়, কীভাবে নিপীড়ন থেকে জন্ম নেওয়া আবেগগুলো—ক্ষোভ, শোক ও নৈতিক প্রতিবাদ—সামাজিক বিভাজন পেরিয়ে মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব সংহতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। যৌথ পরিচয় তত্ত্ব মোতাবেক, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এই যৌথ অভিজ্ঞতা এমন একটি ‘নৈতিক সম্প্রদায়’ গঠন করে, যেখানে ব্যক্তিরা নিজেদের এক চরম সংকটাপন্ন ‘আমরা’ পরিবারের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন (তাজফেল ও টার্নার ১৯৭৯; মেলুচি ১৯৯৫)। আন্দোলনের ফ্রেমিংয়ে যখন রাষ্ট্রীয় বর্বরতা ও অবিচার স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়, তখন তা সরকারের অবস্থানকে অবৈধ এবং আন্দোলনকারীদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তোলে (গ্যামসন, ফায়ারম্যান ও রাইটিনা ১৯৮২; মস ২০১৪বি)।

অভ্যুত্থানের শেষের দিকে সাধারণ পথচারী পরিবারগুলো এবং এমনকি সামরিক আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাও দলে দলে আন্দোলনে যোগ দেন। এক মা এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন:

আমার মেয়ে যখন আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য তীব্র আকুতি প্রকাশ করল এবং আমি দেখলাম ওর বয়সী অগণিত সন্তান রাজপথে নেমে পড়েছে, তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এটি ঘরে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নয়। আমার মনে হয়েছিল, আমাদের মতো অভিভাবকেরা যদি সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করি, তবে বিজয় অর্জন সম্ভব। তাই আমি আমার পুরো পরিবার নিয়ে রাজপথে নেমে পড়েছিলাম—যা সত্যি এক অভূতপূর্ব ও অতুলনীয় অভিজ্ঞতা ছিল। (সিদ্দিক ও অন্যান্য ২০২৫)

একইভাবে অন্য আরেকজন মা বর্ণনা করেছেন কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি সব আন্দোলনকারীকে নিজ সন্তানের জায়গায় বসিয়ে দিয়েছিল:

আবু সাঈদ, মুগ্ধ কিংবা ফাইয়াজের মতো সাহসী তরুণ সন্তানদের যখন একে একে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এরা আমার নিজের সন্তানও হতে পারত...আমি সব সময় নিজেকে সবার সামনে রাখার চেষ্টা করতাম, যেন মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলেও তা কোনো সন্তানের গায়ে না লেগে আমার গায়ে লাগে। একে আপনি নিজের সন্তানকে রক্ষা করার মাতৃসুলভ বা অভিভাবকসুলভ তাড়না বলতে পারেন। তবে সত্য কথা হলো আন্দোলনকারী প্রত্যেক তরুণকে সেদিন আমার নিজের সন্তান মনে হয়েছিল। (সিদ্দিক ও অন্যান্য ২০২৫)

এসব বর্ণনা থেকে প্রমাণ হয় কীভাবে চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পর মোরাল শক, সাধারণ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং কৌশলগত ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে এক বিশাল পাল্টা গণজাগরণ (ব্যাকল্যাশ মোবিলাইজেশন) এবং সাধারণ পথচারীদের সরাসরি অংশগ্রহণের পথ তৈরি হয়েছিল। ব্যক্তিমানুষের সহনশীলতার মাত্রা কমিয়ে এনে এবং বিভিন্ন অংশের মানুষকে একটি অভিন্ন নৈতিক সম্প্রদায়ে একীভূত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা অনিচ্ছাকৃতভাবেই এমন এক সর্বজনীন গণ–আন্দোলনকে প্রজ্বলিত করেছিল, যা পূর্বের সব রাজনৈতিক ভেদাভেদকে তুচ্ছ প্রমাণ করেছিল।

আলোচনা

এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণের প্রেরণাকে পাঠ করা। আন্দোলনকারীদের স্তব্ধ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারের গৃহীত নজিরবিহীন নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিশদ আলোচনার পাশাপাশি, প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের অংশ নেওয়ার পেছনে মূল প্রেরণাগুলো কীভাবে কাজ করেছিল, তা আমি বিশ্লেষণ করেছি। আমার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ এবং তীব্র দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, উভয়ের সমন্বয়েই মূলত পাল্টা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। আমি দেখেছি, প্রতিবাদী ও সাধারণ মানুষ যখন নিপীড়নের নৃশংস ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে পারে, তখনই প্রতিবাদের আকার, মাত্রা, তীব্রতা ও আন্দোলনের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।

আমার গবেষণার প্রশ্ন ছিল, রাষ্ট্রের চরম নৃশংস দমন-পীড়ন ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার বদলে কেন উল্টো এক অভূতপূর্ব গণ–অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়? বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পাঠ করার মাধ্যমে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি, কীভাবে সহিংসতা আবেগময় ও নৈতিক প্রক্রিয়ার এক শৃঙ্খল তৈরি করেছিল এবং সেটা নিষ্ক্রিয় পথচারীদেরও একেকজন সক্রিয় আন্দোলনকারীতে রূপান্তর করেছিল। দমন-পীড়নবিষয়ক সাহিত্য এবং রাজনৈতিক গণজাগরণের তত্ত্বগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমি গবেষণানির্ভর ‘দমন-পীড়ন-থেকে-গণজাগরণ’ (রিপ্রেশন-টু-মোবিলাইজেশন) তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব ও প্রতিষ্ঠা করেছি। এই কাঠামোতে দেখানো হয়েছে কীভাবে মোরাল শক, সংহতি গঠন, যৌথ পরিচয়ের সুদৃঢ়করণ এবং আন্দোলনের কৌশলগত ফ্রেমিং একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।

মোরাল শক তত্ত্বের (জেসপার ২০১১) সঙ্গে সংগতি রেখে আমি দেখিয়েছি যে আহাদ ও সাফকাতের মতো নিষ্পাপ শিশুদের রাষ্ট্রীয় গুলিতে প্রাণ হারানো এবং আবু সাঈদের মতো নিরস্ত্র প্রতিবাদীদের নির্মম হত্যাকাণ্ড মানুষের মনে আকস্মিক নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। এই তীব্র ক্ষোভ মুহূর্তেই মানুষের ভয় বা ভীতির প্রাচীরকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং রাজপথে নামাকে এক নৈতিক দায়িত্বে পরিণত করে। যৌথ আচরণের থ্রেশহোল্ড মডেলে (গ্র্যানোভেটার ১৯৭৮) আরও দেখা যায়, কীভাবে বিশেষ করে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি রাজপথে নামার ক্ষেত্রে ব্যক্তিমানুষের ভীতি বা ঝুঁকির হিসাব-নিকাশকে কমিয়ে দেয়। এর ফলে নিরপেক্ষ দর্শকরাও প্রতিরোধে নামে। গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, ফজরের নামাজের পর হাঁটতে বের হওয়া প্রবীণ নারী কিংবা নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া দাদির মতো নিরপরাধ পথচারীদের ওপর গুলিবর্ষণের খবর পুরো জাতির বিবেকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছিল, যা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা সাধারণ নাগরিকদেরও রাজপথে নামিয়ে এনেছিল।

মোরাল শকের পাশাপাশি আমি দেখিয়েছি যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সামাজিক বিভাজন পেরিয়ে মানুষের মধ্যে আবেগগত সংহতিকে আরও গভীর করেছিল। যৌথ পরিচয় তত্ত্ব (তাজফেল ও টার্নার ১৯৭৯; মেলুচি ১৯৯৫) মোতাবেক, শোষণ, অত্যাচার ও হুমকির অভিন্ন অভিজ্ঞতা একটি জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। বাংলাদেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, তৈরি পোশাক শ্রমিক, শিক্ষক ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে একটি সংকটাক্রান্ত ‘নৈতিক সম্প্রদায়’-এ রূপ নিয়েছিল। অভিভাবকেরা অকপটে বলেছেন কীভাবে তাঁরা আন্দোলনকারী তরুণদের ‘নিজের সন্তান’ মনে করে তাদের রক্ষা করতে মিছিলের প্রথম সারিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এটা ব্যক্তিমানুষের কষ্ট ও যন্ত্রণাকে এক যৌথ সংকল্পে রূপান্তরিত করেছিল। এই সংহতি কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ ছিল না; খাদ্য, ওষুধ ও আইনি সহায়তার মতো স্বতঃস্ফূর্ত মানবিক নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে তা বাস্তব রূপ পেয়েছিল, যা রিসোর্স মোবিলাইজেশন তত্ত্বের (ম্যাকএডাম ১৯৮৬; মেয়ার ও মিঙ্কফ ২০০৪) সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ।

এই প্রক্রিয়ায় আন্দোলনকারীদের ইনজাস্টিস ফ্রেম বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। আন্দোলনকারী ও সাধারণ নাগরিকেরা ‘ইনজাস্টিস ফ্রেম’ (স্নো ও বেনফোর্ড ১৯৮৮) তৈরি ও প্রচার করেছিলেন, যা সরকারের নিষ্ঠুরতাকে উন্মোচিত করে আন্দোলনকে এক পবিত্র নৈতিক দায়িত্বে পরিণত করেছিল। এই ফ্রেমিং শাসকগোষ্ঠীর বয়ানকে অবৈধ করে তুলেছিল, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধকে সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে কোটা সংস্কারের মতো এক সীমিত দাবি ধীরে ধীরে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনের এক ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয়। ক্ষতিকারক পেলেট বুলেটে শিক্ষার্থীদের অন্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিত্র ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিবাদকারীরা সরকারের নিপীড়নকে আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তিতে পরিণত করেছিলেন; এটা আদতে ‘রিপ্রেশন ব্রিঙ্কম্যানশিপ’ কৌশলের ব্যবহার, যা দিন শেষে সরকারের নজিরবিহীন বর্বরতাকে উন্মোচিত করে গণজাগরণকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিল (জোয়েরম্যান ও স্টেইনহফ ২০০৫)।

আমার সিদ্ধান্তগুলো দমন-পীড়নবিষয়ক বিদ্যমান তত্ত্ব ও লেখাজোখা সমর্থন করার পাশাপাশি তা আরও সম্প্রসারিত করেছে। অনেক গবেষকই দমন-পীড়নের বক্ররেখা (ব্রকেট ২০০৫; খাজা ১৯৯৩; ওপ ১৯৯৪) এবং আন্দোলনের ওপর কঠোরতা বাড়লে তা কীভাবে গোপন বা আড়ালে রূপ নেয়, তা তুলে ধরেছেন (ফ্রান্সিসকো ১৯৯৫, ১৯৯৬বি; লিচবাক ১৯৮৭; মুর ১৯৯৮; ও’ব্রায়েন ও ডেং ২০১৫)। কিন্তু এসব গবেষণায় সাধারণ নিরপেক্ষ পথচারীদের আন্দোলনকারী বানানোর পেছনে আবেগময় ও নৈতিক বিষয়গুলো কীভাবে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, তা বহুলাংশে উপেক্ষিত থেকে গেছে। মোরাল শক ও সামাজিক সংহতিকে সামনে এনে আমার প্রস্তাবিত তাত্ত্বিক কাঠামোটি ক্রিশ্চিয়ান ড্যাভেনপোর্ট (২০০৭) এবং জেনিফার আর্ল ও সারাহ সুলের (২০১০) সেই প্রশ্নের জবাব দেয়, কেন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন অনেক সময় নিজের ওপরই উল্টো আঘাত হয়ে ফিরে আসে। পাশাপাশি এটি ‘রিসোর্স মোবিলাইজেশন’ তত্ত্বকেও নতুন মাত্রা দেয়; কেননা যে সহিংসতা আন্দোলন স্তব্ধ করতে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা-ই উল্টো আবেগময়, নৈতিক ও সামাজিক সম্পদের নতুন রসদ জুগিয়ে আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

বাংলাদেশের এই প্রেক্ষাপটের গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত, এটি স্পষ্ট যে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী যখন দমন-পীড়নের মাধ্যমে নৈতিক সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তারা অজান্তেই নিজেদের পতনের বীজ নিজেরাই বপন করে। তাই গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে প্রথাগত কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার অকাট্য প্রমাণ ছড়িয়ে দেওয়া কেবল ঘটনার নথিবদ্ধকরণ নয়; বরং তা আন্দোলনের সংহতি গড়ার মূল কৌশল (মস ২০১৪এ)। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সুযোগ ও রিসোর্স মোবিলাইজেশনের গতানুগতিক তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে নৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব আমার গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে (ম্যাকএডাম ১৯৮৬; টারো ১৯৯৪)। তীব্র ক্ষোভ বা গভীর সমবেদনার মতো আবেগগুলো এক অনুঘটক বা চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে; তাই পথচারীদের আন্দোলনে নামার হিসাবটি কেবল বস্তুগত লাভ-ক্ষতির অঙ্কে না কষে নৈতিক ও বোধগত জায়গা থেকেও ব্যাখ্যা করা জরুরি।

এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করা যেতে পারে। কেবল একটি একক ঘটনার মধ্যেই এই গবেষণার সর্বজনীনতা কিছুটা সীমিত; বিভিন্ন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ ‘পাল্টা গণজাগরণ’–এর সীমা ও শর্তগুলোকে আরও নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পারে। এ ছাড়া মোরাল শক থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয়তায় রূপান্তরের সময় একজন ব্যক্তির আবেগের গতিপথ কীভাবে সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয় বা স্তিমিত হয়, তা দীর্ঘমেয়াদি অনুদৈর্ঘ্য গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। পরিশেষে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক কীভাবে নৈতিক ধাক্কা ও সংহতির বার্তাগুলোকে ছড়িয়ে দেয়, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে ভবিষ্যৎ গবেষণায় সোশ্যাল মিডিয়া ডেটার কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকারের মিশ্র পদ্ধতি (মিক্সড মেথড) ব্যবহার করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের এক ঐতিহাসিক শিক্ষা দেয়: রাষ্ট্রীয় চরম দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়াতে যৌথ নৈতিক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে, নতুন সংহতি গড়ে উঠে রাজনৈতিক যৌথ পরিচয় স্পষ্ট করে তুলতে পারে; এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক অপ্রতিরোধ্য স্রোত সৃষ্টি করতে পারে। এই অন্তর্নিহিত কৌশলগুলোকে উন্মোচিত করার মাধ্যমে আমার এ বিশ্লেষণটি দমন-পীড়নের তত্ত্বকে ‘নিষ্ক্রিয়করণ বনাম সক্রিয়করণ’-এর গতানুগতিক দ্বৈততার বাইরে নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে স্বৈরাচারী শাসনামলে মানুষের নৈতিক ক্ষোভ ও মানবিক সংহতি কীভাবে এক ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি হতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক কর্মী, নীতিপ্রণেতা ও গবেষকদের জন্য এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রান্তটীকা

১ লেখকের গবেষণা দলের সাক্ষাৎকার, ২ জুন, খুলনা।

২ লেখকের গবেষণা দলের সাক্ষাৎকার, ৩ জুন, খুলনা।

৩ লেখকের গবেষণা দলের সাক্ষাৎকার, ৬ জুন, ঢাকা।

৪ লেখকের গবেষণা দলের সাক্ষাৎকার, ১০ জুন, ঢাকা।



লেখক পরিচিতি

ড. মো. সাইমুম পারভেজ একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি গবেষক, শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুলব্রাইট ফেলো হিসেবে বৈশ্বিক যোগাযোগে মাস্টার্স এবং পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশি সহিংস উগ্রবাদীদের ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার। এছাড়া তিনি বেলজিয়ামে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণা করেছেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নরওয়ের এমএফ নরওয়েজিয়ান স্কুলে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইডি ও ইউএনডিপির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নীতি নির্ধারণী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, কনটেন্ট জেনারেশন টিমের নেতৃত্ব প্রদান এবং পরিবেশ ও ব্লু ইকোনমি কোর গ্রুপের সমন্বয়ক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সন্ত্রাসবাদ, ডিজিটাল মিডিয়া ও পরিবেশনীতি নিয়ে তার গবেষণা রয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে ২০২২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘The Politics of Terrorism and Counterterrorism in Bangladesh’ এবং ২০২৪ সালের ‘বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ: প্রযুক্তি, সামাজিক সম্পর্ক ও বয়ানের রাজনীতি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

নোট - এই লেখাটি জার্নাল অফ বাংলাদেশ স্টাডিজে প্রকাশিত "Why Did They Join?: Understanding the Protesters of Bangladesh’s July Uprising" শীর্ষক নিবন্ধের অনুবাদ। ভলিউম ২৭, ইস্যু ২, ডিসেম্বর ২০২৫। দেখুন, https://brill.com/view/journals/jbds/27/2/article-p179_4.xml

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team