প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার: স্বাধীন গণমাধ্যম, নাকি দিল্লির বয়ানের প্রতিধ্বনি?

0


প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার: স্বাধীন গণমাধ্যম, নাকি দিল্লির বয়ানের প্রতিধ্বনি?


একটি পত্রিকা একই সঙ্গে নিজেকে ‘স্বাধীন গণমাধ্যম’ এবং প্রতিবেশীবান্ধব বলে পরিচয় দিতে পারে—এতে আপত্তির কিছু নেই। আপত্তি তখনই শুরু হয়, যখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে: এই ‘প্রতিবেশীবান্ধব’ কি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য, নাকি খবরের কাগজে প্রতিবেশীর জন্য আলাদা একটি নরম বালিশও রাখা আছে? প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কটা মূলত সেখানেই। সমালোচকেরা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে এই দুই পত্রিকার ভাষা অনেক সময় এমন কোমল হয়ে ওঠে, যেন সম্পাদকীয় ডেস্কে লাল কালির পাশে একটি কূটনৈতিক মলমও রাখা আছে।

ষোলো বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়টি যদি একটি অভিধান দিয়ে পড়া হয়, সেখানে কিছু শব্দের অর্থ বেশ মজার। ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ মানে কৌশলগত সহযোগিতা, ‘ভারতের উদ্বেগ’ মানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ, আর বাংলাদেশের উদ্বেগ? সেটি সম্ভবত ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে’। সীমান্তে গুলি, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির ভূমিকা—এসব নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই উঠেছে। কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক সময় প্রশ্নটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রতিবেশীর অস্বস্তি আগে বোঝা যায়, বাংলাদেশের অস্বস্তি পরে। যেন দুই দেশের সম্পর্কের রিপোর্ট করতে গিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকের পাসপোর্টের সঙ্গে একটি দিল্লির ভিসাও প্রয়োজন!

আর আওয়ামী লীগ? এখানেও গল্পটি বেশ চমৎকার। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন নিয়ে সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সমালোচকদের চোখে আপত্তি ছিল সমালোচনার ‘মাত্রা’ ও ‘ভাষা’ নিয়ে। একদিকে সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখা, অন্যদিকে উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের সাফল্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন—সব মিলিয়ে পাঠকের মনে কখনো কখনো এমন অনুভূতি তৈরি হয়েছে, যেন সরকারকে বলা হচ্ছে: ‘ভুল করেছেন, তবে আপনার উন্নয়নটা বেশ সুন্দর হয়েছে।’ ব্যথার জায়গায় ব্যান্ডেজ না দিয়ে সেখানে একটু মেকআপ করে দেওয়ার মতো!

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই দুই পত্রিকাকে ঘিরে ‘ভারতপন্থী’ বা ‘আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ’ হওয়ার অভিযোগ যেমন উঠেছে, তেমনি তাদের প্রকাশিত লেখায় ভারতীয় নীতি ও আওয়ামী লীগের ওপর ভারতের অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনাও রয়েছে। অর্থাৎ, খাঁচার ভেতরের পাখিটিকে একবার ভালো করে দেখতে হবে—সে সত্যিই বন্দি, নাকি মাঝে মাঝে নিজের ইচ্ছায়ই খাঁচার দরজা দিয়ে ঢুকে আবার বের হয়! প্রথম আলো নিজেই আওয়ামী লীগের ওপর ভারতের অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করেছে; ডেইলি স্টারও শেখ হাসিনার ভারতভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতির কথা লিখেছে। এর কারণ ‘ভারতের হয়ে কাজ করছে’—এমন অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য। তাদের দীর্ঘদিনের কভারেজ, সম্পাদকীয় ও শিরোনাম পাশাপাশি রেখে একটু চিন্তা করলেই সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। 

কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সে কারও হয়ে কাজ করে না; সে প্রশ্ন করে সবার কাছে। সরকারকে প্রশ্ন করবে, বিরোধী দলকে প্রশ্ন করবে, প্রয়োজনে ভারতকেও প্রশ্ন করবে, আবার বাংলাদেশের নিজের ভুলকেও আড়াল করবে না। কিন্তু তাদের শিরোনাম ও সম্পাদকীয় দেখে মনে হয়, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কলম কখনো কখনো দিল্লির প্রতি অতিরিক্ত ভদ্র হয়ে যায়। 

তাদের আর্কাইভ দেখলে এটা প্রমাণ হয়ে যায়। পাঠকের মনে তাই ইদানীং প্রশ্ন জাগছে, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কি আদৌ স্বাধীন গণমাধ্যম নাকি দিল্লির বয়ানের প্রতিধ্বনি?   

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team