প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার: ছাপা হয় ঢাকায়, দিল্লির চশমায়

0


একটি পত্রিকা কীভাবে একই সঙ্গে দুই ভালোবাসাকে ষোলো বছর ধরে আগলে রেখে নিজেকে 'স্বাধীন গণমাধ্যম' পরিচয় দেয়? আওয়ামী প্রেম আর ভারত প্রেম—দুই চড়ুই এক খাঁচায়, অথচ খাঁচার গায়ে লেখা 'মুক্ত পাখি'। প্রশ্নটি তুলেছেন পাঠকসমাজ; উত্তর দিচ্ছে ইতিহাস। আমরা এই প্রবন্ধে শুধু ইতিহাসের খাতার পাতা ওল্টেছি। ফলাফল হিসাবে যা দেখা গেল, তা সমীচীন ভাষায় লিখে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ, না হলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বাধা দেওয়ার অপরাধে জেলে ঢুকিয়ে দিবে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা। ১৬ বছর পত্রিকাটির সম্পাদকীয় ডেস্কে একটি অদৃশ্য অভিধান রাখা থাকতো, যা দুই ভাষায় লেখা—দ্রাবিড়-ইন্দো-আর্য নয়, ক্ষমতা ও প্রতিবেশীভাষায়। সেই অভিধান অনুযায়ী 'মৈত্রী' মানে দিল্লির কথা অনুবাদ করে দেওয়া; 'উদ্বিগ্ন প্রতিবেশী' মানে সেই প্রতিবেশী, যার সমালোচনা করা হয় না, কেবল বর্ণনা করা হয়; 'দায়িত্বশীলতা' মানে কভার পেইজ জুড়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। পত্রিকাটির সংবাদের ও এক ধ্রুপদী শুরুর ধরন আছে: "দিল্লি থেকে প্রাপ্ত সূত্রে জানা গেছে..."। ঢাকার খবর, দিল্লির চশমা। প্রতিটি সংকটে প্রথম প্রশ্ন করা হয় না 'জনগণের কী হলো?', করা হয় 'দিল্লির দরবারে এর কী প্রতিক্রিয়া পড়বে?' 

২০০৮ থেকে ২০২৪—ষোলো বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়েছে যেন দিল্লির প্রেস-রিলিজের ব্যাকরণ-অনুবাদ। সম্প্রতি মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রসঙ্গেও পত্রিকাটি একাধিক কলাম প্রসব করে সেখানেও একই প্রশ্ন দিল্লির দরবারে এর কী প্রতিক্রিয়া পড়বে?' একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারত মনে করেছে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক মানেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা; পত্রিকার সম্পাদকীয়ও যেন সেই তত্ত্বের নিয়মিত টীকা হয়ে থেকেছে ।

অর্থাৎ, সম্পাদকীয় টেবিলে দুটো ঘড়ি ঝুলত—একটা ঢাকার সময়, আরেকটা দিল্লির সময়; দুটোই ঠিকমতো চলত, কিন্তু ঢাকার ঘড়িটা দেখার লোক ছিলো না। এবার পাঠক প্রশ্ন করবেন: পত্রিকাটি কি আদৌ সমালোচনা করেনি? করেছে—তবে সেই সমালোচনার ধরন ছিল প্রশংসার পথের বাঁক। শেখ হাসিনার আমলের নিয়ম ছিল এমন: গুমের সংবাদের পাশের পাতায় 'ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন' নামে রংচঙে ফিচার; বাকস্বাধীনতার আহ্বানের শেষ অনুচ্ছেদে 'কঠোর সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার' বিনয়ী স্বীকৃতি; নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হেডলাইনে লেখা শেখ হাসিনার হ্যাট্রিক, ' গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক'। ট্রান্সকম পরিবারের দুই পত্রিকা—একটি ইংরেজি, একটি বাংলা—এই 'সিম্বোলিক অ্যাকমোডেশন'-এর দুই অভিজ্ঞ প্রহরী হয়ে থেকেছে; যে নাচে সমালোচনার ভঙ্গি থাকে, কিন্তু পা পড়ে ক্ষমতার সুরে । অর্থাৎ, ব্যথার ওপর ব্যান্ডেজ নয়, ব্যথার ওপর মেকআপ। ষোলো বছর এই প্রেম চলছিলো; পাঠকরা অবশ্য এর নাম রেখেছে সহজ ভাষায়— দ্য দিল্লি স্টার।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team