নির্বাসন থেকে ক্ষমতার আসনে: তারেক রহমানের এক অনন্য রাজনৈতিক অভিযাত্রা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব কম নেতার জীবনেই নির্বাসন, নিপীড়ন আর প্রত্যাবর্তনের এমন নাটকীয় বাঁক দেখা যায়, যেমনটা দেখা গেছে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে রাজনীতি তার কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে এলেও, সেই উত্তরাধিকারকে টিকিয়ে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ ছিল দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ এবং অনিশ্চয়তায় ভরা।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় সক্রিয় হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। দলীয় রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ এবং সাংগঠনিক সম্প্রসারণে তার ভূমিকা আলোচিত হলেও, একই সঙ্গে তাকে ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনখ্যাত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং হেফাজতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতির প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য পরিবারসহ লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি। সেই যাত্রা যে প্রায় দুই দশক দীর্ঘ নির্বাসনে রূপ নেবে, তা তখন হয়তো তিনি নিজেও অনুমান করেননি।
লন্ডনে থাকাকালীন সময়টি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে জটিল অধ্যায়। ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে চুরাশিটির বেশি মামলা দায়ের হয়, যার মধ্যে দুর্নীতি, ঘুষগ্রহণ, অর্থ পাচার ও একটি গ্রেনেড হামলা-সংশ্লিষ্ট মামলাও ছিল। কয়েকটি মামলায় আদালত তাকে দণ্ডও দেন। বিএনপি নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এসব মামলার সিংহভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা হয়েছিল, তাকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়াই ছিল যার মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে তদানীন্তন সরকার ও কিছু আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রতিবেদনে অর্থ পাচার সংক্রান্ত মিথ্যা অভিযোগও দেয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলা আদালতে খারিজ হয়ে যায়, যা তার দেশে ফেরার পথ সুগম করে।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর, প্রায় সতেরো বছর পর তারেক রহমান স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ঢাকায় ফেরেন। বিমানবন্দরে তাকে ঘিরে যে জনস্রোত ও বীরোচিত সংবর্ধনা দেখা যায়, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃশ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দেশে ফেরার নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, দীর্ঘ ছয় হাজারেরও বেশি দিন পর বাংলাদেশের আকাশ দেখলেন তিনি।
ফেরার দুই মাসের মধ্যেই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হন তারেক রহমান। ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে, প্রায় দুই দশক পর দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি করে। এই নির্বাচনী ফলাফল দলের অভ্যন্তরে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থনের একটি বড় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের একাদশতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ঊনপঞ্চাশ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে সরকার গঠন করেন। এই শপথগ্রহণ আরেকটি কারণেও তাৎপর্যপূর্ণ— প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর বাংলাদেশ একজন পুরুষ সরকারপ্রধান পেল, এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার হাতেই আবর্তিত হয়েছিল দেশের নেতৃত্ব।
ক্ষমতাগ্রহণের পর তারেক রহমান কূটনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। চীন ও মালয়েশিয়া সফর দিয়ে শুরু হওয়া তার রাষ্ট্রীয় সফরগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এপ্রিল ২০২৬-এ টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের প্রভাবশালী একশ ব্যক্তির তালিকায় তার অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক মহলেও তার উত্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে।
তারেক রহমানের এই যাত্রা— উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজনীতি থেকে নির্যাতন, নির্বাসন, আইনি লড়াই, এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন— বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক জটিল আখ্যান হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। তার নেতৃত্ব দেশকে কোন পথে নিয়ে যায়, রাজনৈতিক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি তিনি কতটা রক্ষা করতে পারেন— সেই মূল্যায়নের ভার এখন সময়ের হাতে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment