বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বনাম ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন
বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। পূজা, বড়দিন কিংবা বুদ্ধপূর্ণিমা—উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারও শামিল হয় আনন্দে। এই সহাবস্থান কোনো আরোপিত নীতি নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত এক বাস্তবতা।
মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটে— কিন্তু প্রতিটি ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সম্পত্তি বিরোধের মতো কারণ, ধর্মীয় নিপীড়নের কোনো সংগঠিত রূপ নয়। রংপুরের ঘটনায় তো অপরাধীরাই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী—যা প্রমাণ করে এটি সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
এর বিপরীতে ভারতের চিত্র ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত, আদিবাসী—একাধিক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। জাতিসংঘের সিইআরডি কমিটি সরাসরি সতর্ক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন নিয়ে। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ৮৩০টি হামলার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৩৯টিতে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাভাষী মুসলিমদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সীমান্তের ওপারে।
এই তুলনা থেকে যে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়, তা হলো—বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দাঁড়ায়, ভারতে অভিযোগের কেন্দ্রেই থাকে রাষ্ট্র নিজে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের গতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'মুসলিম মিরর'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু গত জুন মাসের আগের দেড় মাসে বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ২৩টি মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এর বড় অংশই ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে। এর আগে উত্তর প্রদেশে একাই প্রায় তিনশোর কাছাকাছি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার খবর উঠে আসে।
পশ্চিমবঙ্গে এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। নির্বাচনের আগে থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রকাশ্য জনসভায় রাজ্য সরকার পরিবর্তনের ডাক দেন এবং অভিযোগ তোলেন যে তৃণমূল সরকার সীমান্তে বেড়া নির্মাণে বাধা দিয়ে "অনুপ্রবেশকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল" তৈরি করেছে। নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই সেপ্টেম্বরে সামনে আসে আরেকটি বিতর্ক—রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগের নির্দেশে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ ও মাজারগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে, একুশ দফা ফরম পূরণ করিয়ে। রাজ্যজুড়ে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়, এমনকি রাজ্য সরকার আগে হাইকোর্টকে জানিয়েছিল—এমন কোনো নির্দেশ তারা দেয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংসদেও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এক সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি বলেন—"ভারতে যে হারে মসজিদ ভাঙা হয়, বাংলাদেশে কি সে হারে মন্দির ভাঙা হয়?"—এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান।
কারণ ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুদের সবচেয়ে বড় শারদীয় পুজা অনুষ্ঠিত হয়। আর উৎসবের এই সময়টাকেই বেছে নিয়ে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায় একটি চক্র। গুজব ছড়ানো, উসকানিমূলক পোস্ট, মিথ্যা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া—এসব ষড়যন্ত্র প্রায়ই আসে সীমান্তের ওপার থেকেও, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাই প্রশাসন, গণমাধ্যম আর সাধারণ মানুষ—সবাইকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। কোনো গুজবে কান না দিয়ে, কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment