জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, অস্বস্তিতে ভারত?

0

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, অস্বস্তিতে ভারত?

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ২ জুন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত গোপন ব্যালটের নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ৯৯ ভোট, বিপরীতে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। চার দশক পর আবারও বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে ফিরল। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। কারণ ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতৃত্ব কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির অনুগ্রহে পাওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমর্থন। বাংলাদেশের প্রার্থী ১৯০টি ভোটের মধ্যে ৯৯টি ভোট পেয়েছেন—অর্থাৎ এ বিজয়ের পেছনে ছিল বহুপাক্ষিক কূটনীতি, দীর্ঘ প্রচারণা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ। জাতিসংঘের নিজস্ব তথ্যও বলছে, এ পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের আঞ্চলিক রোটেশনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল এবং খলিলুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। ভারতের গণমাধ্যমে এই বিজয়কে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে? ভারতের Times of India নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ‘closely-watched election’ হিসেবে রিপোর্ট করেছিল। এছাড়াও লক্ষ করার মতো বিষয় হলো—বাংলাদেশের জন্য এত বড় একটি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সাফল্যকে ভারতীয় মিডিয়ার বড় অংশ এমন কোনো আঞ্চলিক ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরেনি, যা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিতে পারে।

এখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে—অস্বস্তিটা কি আসলে খলিলুর রহমানকে নিয়ে, নাকি পরিবর্তিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে? কারণ খলিলুর রহমান কেবল একজন নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নন। ভারতের India Today ফেব্রুয়ারিতে তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিশ্লেষণে তাঁকে বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি ‘unsettling variable’ হিসেবে দেখেছিল এবং তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি আলাদা করে তুলে ধরেছিল। অর্থাৎ ভারতীয় বিশ্লেষণী মিডিয়ার অন্তত একটি অংশ খলিলুর রহমানকে এমন একজন কূটনীতিক হিসেবে দেখছিল, যিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একক কোনো শক্তির প্রভাববলয়ের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন।

আর এখানেই সম্ভবত আসল অস্বস্তির জায়গা। বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক অবস্থান যদি হয়—ঢাকা কারও ‘পিছনের উঠান’ নয়, বরং নিজের স্বার্থে দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন, রিয়াদ কিংবা ব্রাসেলস—সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে—তাহলে সেটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর জন্য নিঃসন্দেহে নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশের PGA81 বিজয় সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্র হিসেবে ভারত কূটনৈতিক সৌজন্য দেখাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া যখন প্রতিবেশী দেশের বড় আন্তর্জাতিক অর্জনকে কেবল সংক্ষিপ্ত তথ্য হিসেবে পরিবেশন করে, অথচ সেই একই দেশের পররাষ্ট্রনীতির সামান্য পরিবর্তন নিয়েও দীর্ঘ বিশ্লেষণ, সন্দেহ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশের জন্য তাই এই বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়তো পদটি নিজে নয়; বরং ঢাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর যে আগের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে, সেটিই। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের একজন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচিত হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে—ঢাকা চাইলে আঞ্চলিক সম্পর্কের হিসাবের বাইরে গিয়েও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠিত করতে পারে।

নয়াদিল্লির জন্য এটি একটি অস্বস্তির কারণ। সেটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের আচরণ ও মিডিয়ার খবরগুলো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের দিক থেকে বার্তাটি স্পষ্ট: বন্ধুত্ব থাকবে, প্রতিবেশী সম্পর্ক থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে—কিন্তু বাংলাদেশের কূটনীতি বাংলাদেশের স্বার্থেই পরিচালিত হবে।

আর ভারতীয় মিডিয়ার জন্যও হয়তো সময় এসেছে একটি পুরোনো ধারণা পুনর্বিবেচনার—বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাধীন কূটনৈতিক পদক্ষেপকে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের চশমা দিয়ে দেখার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার। কারণ বাংলাদেশ এখন কেবল ভারতের প্রতিবেশী নয়; সে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যার নিজস্ব কূটনৈতিক সক্ষমতা, স্বার্থ এবং বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে।

খলিলুর রহমানের ৯৯ ভোট তাই শুধু একজন ব্যক্তির জয় নয়। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার ফলাফল এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্পষ্ট—বাংলাদেশের কথা শোনা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, নয়াদিল্লি সেই নতুন বাস্তবতাকে কত দ্রুত মেনে নিতে পারে।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team