বিডিআর বিদ্রোহের নৃশংসতম ঘটনায় জাহাঙ্গীর কবির নানকের ছিল সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড

0


বিডিআর বিদ্রোহের নৃশংসতম ঘটনায় জাহাঙ্গীর কবির নানকের ছিল সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। ঘটনাটিকে দীর্ঘদিন ধরে “বিদ্রোহ” বলে উপস্থাপন করা হলেও পরবর্তী তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে এর পেছনে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত মিলেছে। এই নৃশংসতার অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে সামনে এসেছেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক।

ঘটনার দিন দুপুরের দিকে নানক ও মির্জা আজম সাদা পতাকা হাতে পিলখানার গেট নং-৪-এ হাজির হন। সরকারি বর্ণনায় একে “মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে শান্তি আলোচনা” বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু একাধিক সাক্ষ্য ও তদন্তে এর বিপরীত চিত্র উঠে আসে। তারা বিদ্রোহীদের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ রাখতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার আগে বিভিন্ন বৈঠকে নানকের উপস্থিতির কথা উঠেছে, বিশেষ করে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের বাসায় অনুষ্ঠিত পরিকল্পনা বৈঠকে। সেখানে সেনা কর্মকর্তা হত্যার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয় এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় বলে সাক্ষ্য পাওয়া গেছে।

পিলখানার ভেতরে নানক ও আজম অবাধে চলাচল করতে পারতেন, যেখানে সেনাবাহিনীকে দূরে রাখা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ড চলাকালীন তারা বিদ্রোহীদের সঙ্গে দেখা করেন, লাশ দেখেন এবং পরে সত্য গোপন করেন বলে পুরোনো তদন্ত রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি লাশ উদ্ধারের সময় নানক নোট নিয়েছিলেন এবং তথ্য পাচারের অভিযোগও রয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—তারা সাধারণ ক্ষমার প্রস্তুতি ও ঘোষণায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এই ক্ষমা ঘোষণা হত্যাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে এবং সামরিক অভিযান বিলম্বিত করে। ফলে হত্যাকাণ্ড, লাশ গুম, লুটপাট ও অপরাধীদের পলায়ন অব্যাহত থাকে।

২০২৫ সালে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন এই ঘটনাকে “পরিকল্পিত অভিযান” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কমিশনের মতে, আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে জড়িত ছিল এবং নানকের নাম শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজমসহ অন্যান্যদের সঙ্গে উঠে এসেছে। কমিশন বলেছে, নানক ও আজম পলাতক অবস্থায় ই-মেইলে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক “সমাধানের” নামে সময়ক্ষেপণ করা, যাতে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে না পারে এবং হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন হয়।

পুরোনো কমিশন রিপোর্ট ও সাক্ষ্যে নানকের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ ছিল: ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ, হত্যাকারীদের সহায়তা, সত্য গোপন, সামরিক অভিযানে বাধা এবং অবৈধ ক্ষমা ঘোষণায় সমর্থন। এই সব অভিযোগ মিলে একটি সন্দেহজনক চিত্র তৈরি করে—যেখানে একজন মন্ত্রী সাদা পতাকা হাতে “মধ্যস্থতাকারী” হিসেবে উপস্থিত হয়েও ঘটনার গভীরে জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেন।

পিলখানার সেই নৃশংসতা বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়। জাহাঙ্গীর কবির নানকের ভূমিকা নিয়ে যে সন্দেহ ও অভিযোগ উঠেছে, তা এখনো পূর্ণাঙ্গ বিচার ও প্রমাণের অপেক্ষায়। তবে কমিশনের হাতে আসা সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্ত রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, তার উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ড শুধু শান্তি আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না—বরং ঘটনার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরবর্তী আড়াল করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team