বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাদা পতাকার আড়ালে কী ছিল?

0


বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাদা পতাকার আড়ালে কী ছিল?

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। দেশের ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায়কে দীর্ঘদিন ‘বিদ্রোহ’ বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সৈয়দ আবদাল আহমদের দৈনিক আমার দেশ-এর ১২ জানুয়ারি ২০২৫-এর অনুসন্ধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—এই হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে জাহাঙ্গীর কবির নানকও জড়িত ছিলেন।

অনুসন্ধান অনুসারে, পিলখানার হত্যাকাণ্ড ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে পরিকল্পিত ছিল। ভারতের প্রশিক্ষিত কিলার গ্রুপকে ঢাকায় এনে ভাড়া করা বিপথগামী বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে মিলিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিক, শেখ সেলিম, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম এবং সেনা ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

নানকের ভূমিকা বিশেষভাবে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে ঘটনার দিনের কয়েকটি ঘটনায়। সকালেই হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার পর দুপুরের দিকে তিনি ও মির্জা আজম সাদা পতাকা হাতে পিলখানার গেটে হাজির হন। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের বক্তব্য অনুসারে, বেলা ১টার দিকে তারা পিলখানায় যান। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যমুনায় ১৪ জন ‘বিদ্রোহী’র বৈঠকে তাপস, নানক ও মির্জা আজম উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কথা ওঠে—যা হত্যাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ভারতীয় কিলার গ্রুপের একটি অংশকে খেলোয়াড় বেশে পিকআপে এবং আরেক অংশকে রোগী সাজিয়ে নম্বরবিহীন অ্যাম্বুলেন্সে পিলখানায় ঢোকানো হয়। রাতে তারা আবার অ্যাম্বুলেন্সে করে বেরিয়ে যায়। ফার্মগেটের হোটেল ইম্পেরিয়ালে (সাহারা খাতুনের মালিকানাধীন) ‘র’-এর লোকজন ও কিলাররা অবস্থান নেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি ও সমন্বয়ের অভিযোগ উঠেছে। নানক ও আজম যেন ‘মধ্যস্থতাকারী’র ছদ্মবেশে ঘটনার ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান, যেখানে সেনা ও র‌্যাবকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

তদন্ত কমিটিগুলোর অসম্পূর্ণতাও সন্দেহ বাড়ায়। সেনা তদন্ত কমিটি ও জাতীয় তদন্ত কমিটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম উঠলেও শেখ হাসিনা তাদের রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করতে দেননি। জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত হয়নি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসিরের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তদন্ত কমিটিতে নানক ও মির্জা আজমসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সবকিছু আড়াল করার চেষ্টা চলেছে বলে তিনি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন।

শহীদ পরিবারের সন্তানরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেখানে শেখ হাসিনাসহ ৫৪ জনের তালিকায় জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের নামও রয়েছে। তারা মনে করেন, এটি শুধু বিদ্রোহ নয়—ভারতীয় পরিকল্পনায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগসাজশে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার অভিযান।

পিলখানার সেই নৃশংসতায় সাদা পতাকা হাতে নানকের উপস্থিতি আজও প্রশ্ন তোলে। মধ্যস্থতাকারী না কি ষড়যন্ত্রের অংশীদার—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারের অপেক্ষায়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয়, নানকের ভূমিকা কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পরবর্তী আড়াল করার প্রক্রিয়ায় তার নাম বারবার উঠে এসেছে। শহীদ পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবি আজও অপূর্ণ। পিলখানার সত্য উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত এই সন্দেহের ছায়া থেকে যাবে।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team