বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন: সমন্বিত গুজবের বিপরীতে সত্য জানুন

0

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের একটি চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি কিছু মহলে অতিরঞ্জিত ও একপেশে ব্যাখ্যা প্রচার করা হচ্ছে। এল৩ হ্যারিসের সঙ্গে রেডিও কমিউনিকেশন সরঞ্জাম সংক্রান্ত প্রস্তাব ও সম্ভাব্য চুক্তিকে “গোপন চুক্তি”, “লুটপাট” বা “জাতীয় নিরাপত্তা বিক্রি” হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এ ধরনের উপস্থাপনা তথ্যের আংশিক ব্যবহার, অনুমান এবং আবেগীয় ভাষায় ভরপুর, যা জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি অযথা সন্দেহ তৈরি করে।


### প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রয়োজন


বিশ্বের প্রায় সব দেশই সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়, অ্যাসেম্বলিং, মেইনটেন্যান্স ও প্রযুক্তি সহযোগিতার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও দীর্ঘদিন ধরে চীন, তুরস্ক, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এমন সহযোগিতা চালিয়ে আসছে। রেডিও ও যোগাযোগ সরঞ্জামের ক্ষেত্রে এল৩ হ্যারিসের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা বা চুক্তি কোনো নতুন বা সন্দেহজনক ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ।


“সেনানিবাসে জায়গা বরাদ্দ” বলে যে আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে, তা বাস্তবতাবর্জিত। বিদেশি টেকনিশিয়ানরা কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল, এসকর্ট, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ও স্থায়ী নজরদারির আওতায় কাজ করেন। চীন, রাশিয়া বা তুরস্কের সঙ্গে অন্যান্য প্রকল্পে (যেমন রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প) এ ধরনের ব্যবস্থা নতুন নয়।


### নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (NDA): স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়


সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, এনক্রিপশন প্রযুক্তি, অপারেশনাল ডিটেইলস বা সোর্স কোড প্রকাশ্যে আনা যায় না। এটি করলে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। বিশ্বের প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোতে NDA বা অনুরূপ গোপনীয়তার ধারা সাধারণ বিষয়। এটিকে “গোপন চুক্তি” বলে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা দায়িত্বজ্ঞানহীন। প্রতিরক্ষা খাতের সংবেদনশীল তথ্য সীমিত পরিসরে রাখা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রথা।


### প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাস্তবতা


প্রতিরক্ষা প্রকল্পে পুরোপুরি মূল প্রযুক্তি হস্তান্তর সবসময় প্রথম ধাপে হয় না। SKD (Semi Knocked Down) বা CKD পদ্ধতিতে স্থানীয় অ্যাসেম্বলিং প্রথম ধাপ হতে পারে, যার সঙ্গে মেইনটেন্যান্স সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, স্পেয়ার পার্টস উৎপাদন ও পর্যায়ক্রমিক আপগ্রেডের সুযোগ থাকে। এটিকে “শুধু অ্যাসেম্বলিং” বলে খাটো করে দেখানো বিভ্রান্তিকর। অনেক দেশ এভাবেই ধাপে ধাপে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলে।


### দরপত্র, সময়সীমা ও আর্থিক অভিযোগ


অভিযোগকারীরা ২৮ দিনের সময়সীমা, দরপত্র প্রক্রিয়া, ১,১১৭ কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু কোনো স্বাধীন অডিট রিপোর্ট, সরকারি তদন্ত বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (যেমন আইএসপিআর) বক্তব্য নেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক টেন্ডারে সময়সীমা বিভিন্ন কারণে সংক্ষিপ্ত হতে পারে—জরুরি প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত উপযোগিতা ইত্যাদি। অভিযোগগুলো বর্তমানে প্রমাণহীন এবং অনুমানভিত্তিক।


### বাংলাদেশ ফার্স্ট: বহুমুখী অংশীদারিত্ব


বাংলাদেশ কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, রাশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, মূল্য, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বিবেচনায় সম্পর্ক রক্ষা করে। একটি চুক্তিকে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিরোধী হিসেবে দেখানো দ্বৈত মানদণ্ড। বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি এ ধরনের সহযোগিতাকে শক্তিশালী করে।


### দায়িত্বশীলতার আহ্বান


জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে আলোচনা হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। “গোপন চুক্তি”, “সিন্ডিকেট”, “বিদায়লগ্নে লুটপাট” — এ ধরনের আবেগীয় ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাষা প্রোপাগান্ডার মতো শোনায়, যা সাংবাদিকতার মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।


বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সাইবার হুমকি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত নিরাপত্তায় নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ অবকাঠামো অপরিহার্য। যেকোনো প্রকল্পে স্বচ্ছতা, আর্থিক নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই থাকা উচিত—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রমাণহীন অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস ছড়ায়, যা দেশের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর।


দায়িত্বশীল নাগরিক ও মিডিয়ার উচিত তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা, যাতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি সবার সমর্থন পায়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সবার ঊর্ধ্বে।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo