পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বিনষ্ট করছে কারা?

0

 পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বিনষ্ট করছে কারা?

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তির পর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজও এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—এই অস্থিরতার মূল উৎস কারা? বাস্তবতা হলো, পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি সবচেয়ে বেশি বিনষ্ট করছে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ক্ষমতার লড়াই। বিশেষ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস/পিসিজেএসএস)-এর বিভিন্ন গ্রুপের দীর্ঘদিনের সংঘাত এখন সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে।

১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির পর জেএসএস-এর মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইউপিডিএফ গঠিত হয়। তারপর থেকে এই দুই গোষ্ঠী এবং তাদের অভ্যন্তরীণ উপদলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে অব্যাহত সংঘাতে জড়িয়ে আছে। এলাকা দখল, চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ এবং অস্ত্রশস্ত্রের দাপট বজায় রাখার প্রতিযোগিতাই তাদের মূল এজেন্ডা। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, ১৯৯৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জেএসএস-এর হামলায় শতাধিক ইউপিডিএফ সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকেও জেএসএস কর্মীদের ওপর নিয়মিত হামলার অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাঘাইছড়ি, পানছড়ি, দীঘিনালা, সাজেকসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো সংঘর্ষে একাধিক নিহত ও আহতের খবর পাওয়া গেছে। অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেও তাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়েছে। এসব সংঘাতে সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, মানুষ রাতে ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছে।

এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ‘জনগণের অধিকারের প্রতিনিধি’ বলে দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে তারা জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের আধিপত্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। একদিকে তারা সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচার চালায়, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ চালিয়ে এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি রাখে। ফলে সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি জনগণ দ্বিমুখী চাপে পড়েছে—একদিকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জুলুম, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উন্নয়নের অভাব।

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে এই আন্তঃগোষ্ঠী সংঘাত ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যারা জনগণের নামে রাজনীতি করে কিন্তু জনগণকেই জিম্মি করে রাখে, তাদের আসল চেহারা এখন আর গোপন নেই। শান্তি চুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে সশস্ত্র রাজনীতি ছেড়ে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথে আসতে হবে। নইলে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ আর কতদিন এই রক্তক্ষয়ী ক্ষমতার লড়াইয়ের শিকার হয়ে থাকবে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বিনষ্ট করছে মূলত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের স্বার্থপরতা ও সংঘাত। জনগণের স্বার্থ সবার উপরে রাখলেই কেবল স্থায়ী শান্তি সম্ভব।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo