পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যা: জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে আঞ্চলিক নেতারা কোথায়?
সাম্প্রতিক প্রবল বর্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা ও ভূমিধসে অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হয়েছে, ফসল নষ্ট হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুসারে এই দুর্যোগে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এই সংকটের মুহূর্তে সেনাবাহিনীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা দ্রুত মাঠে নেমে উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা সেবা এবং রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো নৌকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে দুর্গত এলাকায় পৌঁছেছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এই প্রচেষ্টা অনেক পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনেছে।
কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এ সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা, সুহাস চাকমাসহ ইউপিডিএফের বিভিন্ন গ্রুপের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সরাসরি ত্রাণ বিতরণ বা উদ্ধার কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের খবর সামনে আসেনি। পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনামূলক পোস্ট ও বিবৃতির মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। কিন্তু দুর্যোগকালীন সময়ে তাদের ভূমিকা প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। স্থানীয় সূত্রগুলোতে অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু গোষ্ঠী এলাকায় চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণের নেটওয়ার্ক চালিয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবিকা ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। বন্যার মতো সংকটেও এ ধরনের তৎপরতা কমেনি বলে অনেকে মনে করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জটিল। ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির পরও পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সন্তু লারমাসহ নেতারা বারবার চুক্তির বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়, উন্নয়ন প্রকল্প চলছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে। কিন্তু সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দ্বিমুখী চাপে রয়েছে — প্রাকৃতিক দুর্যোগের একদিকে, আর অন্যদিকে রাজনৈতিক-সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণের চাপ।
এই দুর্যোগ প্রমাণ করেছে যে, শুধু কথা ও রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। দুর্ভোগের সময় সরাসরি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ত্রাণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কাজ করাই আসল নেতৃত্বের পরিচয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এখন শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন চায়। চাঁদাবাজি, বিভেদ ও ফাঁকা বুলির রাজনীতির বাইরে এসে সব পক্ষকে যদি জনকল্যাণে একযোগে কাজ করতে হয়, তবেই এ অঞ্চলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
দুর্যোগ শেষ হলেও পার্বত্যবাসীর দুর্ভোগ কাটবে না, যতক্ষণ না সত্যিকারের সেবামূলক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে এবং জনগণের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়। সময় এসেছে এই সত্যকে মেনে নেওয়ার।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment