শিক্ষার্থী আন্দোলনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ছায়া: কে লাভবান হচ্ছে, কে উস্কানি দিচ্ছে

0

 শিক্ষার্থী আন্দোলনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ছায়া: কে লাভবান হচ্ছে, কে উস্কানি দিচ্ছে

গত ১৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে চলমান আন্দোলন এখন শুধু পরীক্ষা বা আবহাওয়ার ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। বন্যা-জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বাধা, পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে ত্রুটি এবং শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও আন্দোলন দ্রুত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। ‘মার্চ টু এডুকেশন মিনিস্ট্রি’ কর্মসূচি, সড়ক অবরোধ এবং দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দেখে মনে হচ্ছে—এখানে শুধু শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি নয়, কিছু মহলের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও কাজ করছে।

এ ধরনের আন্দোলনে ঘি ঢালবে আওয়ামী লীগ। কিছু শিক্ষার্থীকে উস্কে দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করবে তারা। ইতিমধ্যে অনলাইন প্রচারণায় আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত একাধিক ব্যক্তির সক্রিয়তা দেখা গেছে। অতীতেও দেখা গেছে—শিক্ষার্থী আন্দোলনে ঢুকে অরাজকতা তৈরি করে পতিত শক্তি ফেরার সুযোগ খোঁজে। এবারও সেই পুরনো খেলা চলতে পারে। সতর্ক থাকা জরুরি।

একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে জামায়াত ও এনসিপির ভূমিকা নিয়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতারা এখন এনসিপির ব্যানারে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলছেন। নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলমসহ কয়েকজনের বক্তব্যে স্পষ্ট—তারা দাবির যৌক্তিক সমাধানের চেয়ে পদত্যাগ চাপ প্রয়োগের পথেই বেশি জোর দিচ্ছেন। দেশের বন্যা পরিস্থিতি, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার কথা বাদ দিয়ে কি তারা ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ স্বপ্ন দেখছেন? নাজুক পরিস্থিতি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা কি চলছে? শিক্ষার্থীদের দাবির সমাধান না খুঁজে শুধু পদত্যাগের স্লোগান দিয়ে উস্কানি দেওয়ার পেছনে কী উদ্দেশ্য—এ প্রশ্ন এখন জরুরি।

অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের ভূমিকা আরও সন্দেহজনক। দেশের বাইরে বসে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছেন, তাদের অনেকেই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝেন না। বন্যা, জলাবদ্ধতা, পরীক্ষা কেন্দ্রের অবস্থা—এসব সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তবুও তারা হ্যাশট্যাগ, ভুয়া ছবি-ভিডিও আর উত্তেজক কনটেন্ট দিয়ে শিক্ষার্থীদের উসকাচ্ছেন। আন্দোলন মানেই যে তাদের উস্কানি—এমন ধারণা থেকে সাবধান থাকা দরকার। দেশের বাস্তবতা আর অনলাইনের আবেগ—দুটো আলাদা জিনিস।

শিক্ষামন্ত্রীর দোষ কী? কোচিং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, যথাসময়ে পরীক্ষা নেওয়া, শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনা, শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা—এগুলো কি অপরাধ? বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু পুরো ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের চেষ্টাকেই আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়ে পদত্যাগ দাবি করা কতটা যৌক্তিক? সচেতন অভিভাবকরাও বলছেন—বারবার পরীক্ষা পেছালে সেশনজট ও মানসিক চাপ বাড়বে। শুধু বন্যাকবলিত এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে বাকি জায়গায় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়াই বাস্তবসম্মত। যা ইতোমধ্যে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুয়া খবর ও গুজব। আন্দোলনকে ঘিরে লাশ সংক্রান্ত সংবাদ, পুরনো সহিংসতার ভিডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি দ্রুত ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কে এই পরিকল্পিত প্রচারণা চালাচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ইতিমধ্যে ২০২৪ সালের ঘটনা মিশিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের ভুয়া নিউজ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শিক্ষার্থীদের দাবি উপেক্ষা করা যায় না। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিছু এলাকায় পরীক্ষা স্থগিত, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষা এবং নতুন সময়সূচি—এসব বিষয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে সরকার নিয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের পুরনো খেলা, এনসিপি-জামায়াতের চাপ প্রয়োগ, বিদেশি অ্যাকটিভিস্টদের উস্কানি এবং ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি—এসব থেকে সতর্ক না থাকলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের নাজুক পরিস্থিতিতে আর কোনো অস্থিরতা সহ্য করার মতো অবস্থা নেই।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo