আদানি চুক্তিতে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদী সংকট
ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ চুক্তিটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি বড় বিতর্ক ও আর্থিক রক্তক্ষরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে 'রিসার্চ গেট' জার্নালে প্রকাশিত প্রায় ৬০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা রিপোর্ট এবং ২০২৫ সালে জাতীয় রিভিউ কমিটির বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই চুক্তিটি বাংলাদেশকে ২৫ বছরের এক দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে একদিকে যেমন বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বিশাল বোঝা চাপানো হয়েছে, অন্যদিকে এর একতরফা শর্তাবলী দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
১. অতিরিক্ত ট্যারিফ ও অযৌক্তিক উচ্চ মূল্যের বোঝা
আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে এর অস্বাভাবিক ট্যারিফ বা ক্রয়মূল্যে। ২০১৭ সালে যখন ভারত থেকে আমদানি করা অন্যান্য বিদ্যুতের গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৪.৪৬ সেন্ট, তখন আদানির সাথে চুক্তি করা হয় প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে অর্থাৎ ৮.৬১ সেন্টে।
পরবর্তী বছরগুলোতে এই ব্যবধান আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ আদানিকে ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ খরচ দিয়েছে ১৪.৮৭ টাকা, যেখানে ভারতেরই অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে ইউনিট প্রতি মাত্র ৯.৫৭ টাকায়। অর্থাৎ আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে ইউনিট প্রতি ৫.৩০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। ওই একটি অর্থবছরেই ৮.১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয়ের কারণে বাংলাদেশের অতিরিক্ত লোকসান হয়েছে ৪,৩২৫ কোটি টাকা। এই মূল্য বাংলাদেশের নিজস্ব মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিক্রয়মূল্য (৮.৪৫ টাকা/ইউনিট) এবং নেপালের জলবিদ্যুতের (৮.৩৫ টাকা/ইউনিট) তুলনায় প্রায় ৫৫% বেশি। সার্বিকভাবে, আদানির বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে, যা ২৫ বছরের চুক্তি মেয়াদ শেষে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার এক বিশাল আর্থিক ক্ষতিতে রূপ নেবে।
২. ক্যাপাসিটি চার্জের মারাত্মক ফাঁদ
এই চুক্তির অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো আদানির অনুকূলে তৈরি করা ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়ার শর্ত। বাংলাদেশ আদানি থেকে বিদ্যুৎ নিক বা না নিক, ২৫ বছরের চুক্তি মেয়াদে অন্তত ৪,২০০ কোটি টাকার ফিক্সড পেমেন্ট এক্সপোজার নিশ্চিত রাখতে হবে। বিদ্যুৎ না নিলেও প্রতি মাসে আদানিকে ৩৫২ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশের অন্যান্য বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাধারণ ক্যাপাসিটি চার্জ যেখানে ইউনিট প্রতি ২.৮৩ টাকা, সেখানে আদানির ক্ষেত্রে তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.২৬ টাকা। অথচ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চাইলে পূর্ববর্তী অন্যান্য চুক্তির মতো (যেমন ২০২১ সালে NVVN-এর সাথে করা চুক্তির মতো) 'No Electricity, No Payment' শর্ত যুক্ত করতে পারত, যা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যদি দেশীয় কম খরচের সৌরবিদ্যুৎ বা জলবিদ্যুৎ পাওয়াও যায়, তবুও চুক্তি অনুযায়ী আদানিকে এই বিপুল অর্থ পরিশোধ করে যেতেই হবে।
৩. কয়লার দাম ও একতরফা পরিবহন ব্যয়
আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লাভিত্তিক হওয়ায় এর পরিবর্তনশীল ব্যয় (Variable Cost) প্রধানত কয়লার আন্তর্জাতিক দাম ও পরিবহন খরচের ওপর নির্ভরশীল। চুক্তি অনুযায়ী, আদানি অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা আমদানি করবে এবং সেই কয়লার বাড়তি দাম, জাহাজ ভাড়া ও গোড্ডা পর্যন্ত পরিবহন খরচের সম্পূর্ণ দায় বহন করতে হবে বাংলাদেশকে।
এছাড়া গোড্ডা থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ আনার জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইনের হুইলিং চার্জও বাংলাদেশকে দিতে হবে, যা প্রতি বছর ১% হারে বৃদ্ধি পাবে। এই সমস্ত খরচের সম্মিলিত প্রভাবে গোড্ডা থেকে আসা বিদ্যুতের দাম বছরে গড়ে প্রায় ৫.৪৯% হারে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ২০৪৭ সাল নাগাদ আদানির বিদ্যুতের মূল্য ইউনিট প্রতি দাঁড়াবে প্রায় ৩৬.৪ টাকায়, অথচ ভারতে সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ যেখানে প্রতি বছর ১০% হারে কমছে।
৪. ডলার ও বিনিময় হারের ঝুঁকি এবং করের অন্যায্য শর্ত
চুক্তির সমস্ত পেমেন্ট মার্কিন ডলারে করতে হওয়ায় বাংলাদেশ তীব্র মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ডলারের বিপরীতে যদি বাংলাদেশী টাকার মান মাত্র ১০% হ্রাস পায়, তবে বিদ্যুৎ ক্রয়ের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও প্রতি ১ বিলিয়ন ডলার পেমেন্টে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ১,২০০ কোটি টাকা বেশি গুণতে হবে।
পাশাপাশি কর নীতিতেও রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ একতরফা শর্ত। ভারত সরকার যদি ভবিষ্যতে তাদের কর্পোরেট কর বৃদ্ধি করে, তবে তার বাড়তি খরচ বাংলাদেশকে দিতে হবে। অথচ ভারত সরকার যদি আদানিকে কোনো প্রকার কর মওকুফ বা কর ছাড় দেয়, তবে সেই ছাড়ের কোনো আর্থিক সুবিধা বা ডিসকাউন্ট বাংলাদেশ পাবে না।
৫. দীর্ঘমেয়াদী সংকটের বর্তমান রূপ ও জ্বালানি খাতের বাস্তবতা
বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯,০০০ মেগাওয়াট হলেও গ্যাস, জ্বালানি ও বকেয়া বিল সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, তখন আদানির বিদ্যুতের পেছনে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হচ্ছে। এই ২৫ বছরের বাড়তি টাকা যদি দেশীয় জ্বালানি সংকট সমাধানে ব্যয় করা যেত, তবে দেশীয় সক্ষমতা দিয়েই চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতো।
হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এই অসম চুক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিশি লড়াইয়ে গেলেও চুক্তির শর্তাবলীর কারণে বিরোধ নিষ্পত্তি বেশ জটিল। বকেয়া বিলের বিরোধে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আদানি তাদের সরবরাহ করা ১৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কমিয়ে একপর্যায়ে মাত্র ৪৭ মেগাওয়াটে নামিয়ে এনেছিল। ২০২৫ সালের জুনে সরকার বকেয়া মেটাতে ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার এককালীন এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করার পরেও গত মাস পর্যন্ত আদানির বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
সবমিলিয়ে, আদানির এই চুক্তিটি কেবল একটি বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি নয়, বরং এটি দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতকে পরাধীন ও শোষিত করার এক চরম দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment