কূটনীতির নতুন সমীকরণে তারেক রহমানের ভারত সফর
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এখন আর সাধারণ দ্বিপক্ষীয় সফর নয়। এটি পরিণত হয়েছে সার্বভৌমত্ব, বিচারপ্রক্রিয়া এবং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে।
ভারত বলছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ এখনো বহাল। ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু ঢাকা স্পষ্ট করে দিয়েছে—‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি না হলে সফর হবে না। আর সেই পরিবেশের কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম রোববার (১৬ আগস্ট) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন সেই প্রক্রিয়াকে ‘বিকৃত’ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন সাবেক সরকারপ্রধান ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। ঢাকা এটাকে সহ্য করতে রাজি নয়।
ঢাকার অবস্থান এখন সোজাসাপটা। ভারতকে দ্রুত এবং স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণে। একই সঙ্গে শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের হস্তান্তর করতে হবে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী। এই দুই বিষয়ে অগ্রগতি ছাড়া ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি হবে না বলেই ঢাকার বার্তা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম—টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস—এই অবস্থানকে ‘রেড লাইন’ হিসেবেই তুলে ধরেছে। দিল্লির সূত্রগুলো বলছে, আমন্ত্রণ বাতিল হয়নি। আগস্টের ২১ তারিখকে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের তারিখ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের ১২-১৩ তারিখে ব্রিকস সম্মেলনও রয়েছে। কিন্তু সময়সীমা সংকুচিত হয়ে আসছে। দিল্লি চাইছে সময় এবং কূটনৈতিক পরিসর। ঢাকা চাইছে স্পষ্ট জবাব।
এখানেই মূল টানাপোড়েন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কোনো বিচ্ছিন্ন ইস্যু নয়। এটি এখন দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। বাণিজ্য, জ্বালানি, পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা—সবকিছুই এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ঢাকার জন্য এটি সার্বভৌমত্ব ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়। দিল্লির জন্য এটি রাজনৈতিক, আইনি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার জটিল সমন্বয়।
৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। জীবনহানির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। ভারত বলেছে, সেই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং তারা হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না। কিন্তু ঢাকার কাছে বিষয়টি কেবল একটি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের মাটিতে অবস্থানরত একজন দণ্ডিত ব্যক্তি যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন—এটাই ঢাকার দাবি।
তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। ভারতকে প্রথম সফরের গন্তব্য না বানিয়েই তিনি ঐতিহ্য ভাঙেছেন। এখন ভারত সফর যদি হয়, তাহলে তা হতে পারে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আর যদি শেখ হাসিনা ইস্যুতে কোনো বাস্তব অগ্রগতি না হয়, তাহলে এটি হতে পারে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা।
ঢাকা এখন অপেক্ষা করছে দিল্লির জবাবের। আমন্ত্রণ খোলা রাখা এক বিষয়, ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করা অন্য বিষয়। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—এই দুই অবস্থানের মাঝে কতটা বাস্তবসম্মত সমঝোতা সম্ভব তার ওপর।
সফর কবে হবে, আদৌ নির্ধারিত সময়ে হবে কি না—সেটি এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বিষয় আর অস্পষ্ট নয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কেন্দ্রীয় কূটনৈতিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—সম্পর্ক নতুন করে সহযোগিতার পথে এগোবে, নাকি আরও কিছু সময় কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় থাকবে।
এখন নজর—দিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment