গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬: ভারতের ১৩, বাংলাদেশের ৪২—তবু আঙুল ওঠে প্রতিবেশীর দিকে
ভারতের মুখে প্রতিবেশি বাংলাদেশ নিয়ে বহুদিনের রাজনৈতিক বয়ান এবার নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স বা GTI ২০২৬-এর দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র তেমনই একটি উদাহরণ। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিসের প্রকাশিত এই সূচকে ১৬৩ দেশের মধ্যে পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস-প্রভাবিত দেশ, স্কোর ৮.৫৭৪। আফগানিস্তান ১১তম, ভারত ১৩তম—স্কোর ৬.৪২৮। আর বাংলাদেশ ৪২তম, স্কোর মাত্র ২.২৮৬।
এখানে মূল বিষয় শুধু র্যাঙ্কিং নয়; বরং সূচকটি আসলে কী মাপছে। GTI কোনো দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা কোনো সরকারের বক্তব্যের ভিত্তিতে “কে সন্ত্রাসী” তা নির্ধারণ করে না। হামলার সংখ্যা, নিহত ও আহতের সংখ্যা এবং জিম্মি হওয়ার ঘটনাসহ সন্ত্রাসবাদের বাস্তব প্রভাবকে পাঁচ বছরের weighted average-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করে এই সূচক। আর এই সূচকে স্পষ্ট করে দেখা গেল, ভারতের অবস্থান ১৩ আর বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম অবস্থান। তবু ভারত কথায় কথায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের আঙুল তোলে। এখন বলবো, রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত পরিমাপক দিয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা-চিত্র তুলনার সুযোগ হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
২০২৫ সালের তথ্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। GTI বলছে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ কমেছে; ভারতে কমেছে মাত্র ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট সন্ত্রাসী হামলা ১৩.৪ শতাংশ এবং সন্ত্রাসবাদে মৃত্যু প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ অঞ্চলটি একেবারে সন্ত্রাসমুক্ত হয়ে যায়নি, কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতির উন্নতির মাত্রা ভারতের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
তাহলে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: বাংলাদেশকে ঘিরে নিরাপত্তা-আশঙ্কার রাজনৈতিক বয়ান যখন বারবার সামনে আসে, তখন এই আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান দেখলে চিত্র পরিস্কার হয়। সীমান্ত উত্তেজনা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চরমপন্থা কিংবা নিরাপত্তা—এসব অবশ্যই বৈধ রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ। কিন্তু উদ্বেগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে নিয়মিত নিরাপত্তা-হুমকি হিসেবে চিত্রিত করতে হলে তার পক্ষে শক্ত তথ্যও থাকতে হবে। GTI-র সাম্প্রতিক ফলাফল অন্তত বলছে, ২০২৫ সালে সন্ত্রাসবাদের প্রভাবের বিচারে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অনেক নিচে ছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সূচককে ভারতের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের স্কোর কমেছে মানেই দেশটি এখন ভারতের তুলনায় সন্ত্রাসের ঝুঁকি থেকে মুক্ত। ভারতের ১৩তম অবস্থান মানে ভারত যে অস্থিতিশীল রাষ্ট্র—েএটা GTI এর ইনডেক্স দেখলেই বোঝা যায়। এই তথ্যটি একটি আয়না: সন্ত্রাসবাদ একটি আঞ্চলিক সমস্যা এবং এর মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সীমান্ত নিরাপত্তা—সবই প্রয়োজন। কিন্তু নিজের পাছায় ময়লা রেখে অন্যের দিকে আঙুল তোলা কতোটা কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার তা ভারত নিজেই বুঝুক।
সুতরাং প্রশ্নটি হওয়া উচিত “কে কাকে দোষ দেবে”; নাকি “কার কাছে কী প্রমাণ আছে?” কথায় কথায় প্রতিবেশীকে সন্দেহের চোখে দেখা সহজ, কিন্তু আন্তর্জাতিক সূচক যখন অপেক্ষাকৃত ভিন্ন ছবি দেখায়, তখন সেই সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও জরুরি।
বাংলাদেশকে নিরাপত্তা-ঝুঁকির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপনের আগে ভারতের উচিত নিজ দেশের বাস্তব সন্ত্রাস-চিত্রও আলোচনায় আনা। কারণ নিরাপত্তার রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আবেগ নয়—প্রমাণ।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment