পতিত শক্তির নাশকতামূলক খেলা: জঙ্গি কার্ড, গুজব ও কূটনৈতিক লঙ্ঘন

0


পতিত শক্তির নাশকতামূলক খেলা: জঙ্গি কার্ড, গুজব ও কূটনৈতিক লঙ্ঘন

২৪ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকার মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে স্থানীয়দের। একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে লাল আলো জ্বলছিল। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে, সেই ছাতার ভেতরে লুকানো ছিল একটি শক্তিশালী পাইপ বোমা। প্রায় দেড় কেজি সালফার, বিয়ারিংয়ের বল আর বৈদ্যুতিক সার্কিট দিয়ে তৈরি সেই বোমা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে ছাতা খোলার বাটন চাপলেই বিস্ফোরণ ঘটত। ঠিক সে সময় উল্টো রথযাত্রার মিছিল এলাকায় চলছিল। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে বোমাটি ধ্বংস করা হয়, যদিও অপারেশনের সময় এক পথচারী চোখে আহত হন।

মাত্র ছয় দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে আশুলিয়ার চারাবাগ খেজুরবাগান এলাকায় আরেকটি ঘটনা ঘটে। একটি চায়ের দোকানের সামনে মুখোশধারী এক ব্যক্তি ব্যাগ রেখে চলে যায়। দোকানি ও স্থানীয়রা সন্দেহ করে ব্যাগ খুলে দেখেন, ভেতরে টেপ মোড়ানো একটি প্রেশার কুকার। পুলিশ এসে নিশ্চিত করে, এটাও শক্তিশালী আইইডি। রাসায়নিক বিস্ফোরক আর প্রচুর বিয়ারিং বল দিয়ে তৈরি সেই বোমা পরদিন ভোরে খোলা মাঠে নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করা হয়।

এরপর ১ আগস্ট মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে সন্দেহজনক ব্যাগ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। স্টেশন সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। পরে পরীক্ষায় দেখা যায়, একটিতে জর্দা আর পানপাতা, অন্যটিতে শুধু আবর্জনা। কোনো বিস্ফোরক ছিল না। গুজবই ছিল আসল খেলোয়াড়।

এই ঘটনাগুলো কাকতালীয় বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সের্জিও গর ঠিক এই সময়েই ঢাকায় ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সময়ে জনবহুল স্থানে এমন বোমা ও গুজব ছড়ানোর পেছনে পরিকল্পিত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তদন্তে দেখা গেছে, মতিঝিল ও আশুলিয়ার বোমা একই নেটওয়ার্কের কাজ। সিটিটিসি সাভার থেকে সন্দেহভাজন নিও-জেএমবি সদস্য মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করেছে। তার জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তিনি ও তার মেন্টর ‘বোমারু মামুন’ এই বোমাগুলোর সঙ্গে জড়িত।

তবে অনেকের মতে, এর পেছনে শুধু জঙ্গি গোষ্ঠী নয়, পতিত আওয়ামী লীগ ও হাসিনাকে আশ্রয়দাতা দেশের পরোক্ষ ভূমিকাও থাকতে পারে। ৫ আগস্ট ঠিক এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা ভারতের মাটি থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তিনি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন এবং ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার এটিকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ভারত বলেছে, এটি বেসরকারি আয়োজন এবং তারা বক্তব্য সমর্থন করে না। তবুও একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিবেশী দেশের মাটি থেকে এভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে শতাধিক বোমা হামলা চালিয়েছিল জেএমবি। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থেকেও দেশকে ‘জঙ্গিবাদে ছেয়ে গেছে’ বলে তকমা দিয়ে তীব্র রাজনীতি করেছিল। আজকের পরিস্থিতিতেও একই ধরনের জঙ্গি কার্ড ব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। পতিত শক্তি ও তাদের সমর্থকরা দেশে অস্থিরতার ছবি তুলে ধরে নতুন সরকারকে চাপে ফেলতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দিতে চাইছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট প্রতিটি ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ করেছে। মেট্রো স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। তদন্ত চলছে এবং দায়ীদের ধরার অভিযান অব্যাহত আছে। জনগণের সহায়তায় এই প্রহরা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পরও কিছু মহল অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা ছাড়েনি। কখনো জঙ্গি কার্ড, কখনো গুজব, কখনো বাইরের মাটি থেকে বক্তব্য—সবকিছুই ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের সতর্ক প্রহরা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এখন পর্যন্ত সেই চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team