প্রতিবছর দেশি-বিদেশি চাকমাদের কাছে ১৭ আগস্ট যেন বাতের ব্যথার মতো এক চিকন ব্যথা জাগিয়ে তোলে—কেন তারা ভারতীয় হতে পারল না? ১৯৪৭ সালে পারেনি, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম করেও পারেনি। এখনও তাদের সেই চেষ্টা অব্যাহত আছে।
“সতত তুমি পড় মোর মনে”—১৭ আগস্ট, ব্যর্থ ভারতভুক্তি দিবস!
এরা এখনো এর দায় ঠেলে দেয় মুসলিম বাঙালিদের কথিত ষড়যন্ত্রের দিকে। এখন মোদির ‘অখণ্ড ভারত’-এর ট্রেনে চড়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে চায়।
তাদের সশস্ত্র দলগুলো এখনো দাপিয়ে বেড়ায় পাহাড়ের জনপদে। স্বপ্ন তাদের ভারতের ২৯তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হওয়া।
কিন্তু কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অংশ হলো, তার একটি গবেষণালব্ধ সূত্র পাওয়া যায় ড. আনন্দ বিকাশ চাকমার লেখা ‘কার্পাস মহল থেকে শান্তি চুক্তি—পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নীতির ইতিহাস’ গ্রন্থের ১৫৯–১৭৭ পৃষ্ঠায়, পঞ্চম অধ্যায়ে। অধ্যায়ের শিরোনাম—‘দেশভাগের রাজনীতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাড়াকাড়ি’। কিন্তু অধিকাংশ চাকমা এই বইটি পড়েনি। পড়লেও তা মানে না।
চাকমারা নিজেদের খাসলিয়াতের কারণে বারবার ঐতিহাসিক ভুল করে এসেছে।
১৯৩৫ সালে তারা ভারতীয় প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার অধীনে না থাকার জন্য জোরদার দাবি করে সফল হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মুহূর্তে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো কেউ ছিল না।
বরং তিন রাজা—মিলিত হিলম্যান অ্যাসোসিয়েশন, কামিনী মোহন দেওয়ান ও স্নেহ কুমার চাকমা—তিনটি আলাদা আলাদা ফর্মুলা নিয়ে হাজির হলে বাউন্ডারি কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি।
এদিকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ—উভয় পক্ষই পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিজেদের ভাগে দেওয়ার পক্ষে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেসের দাবি ছিল হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের ভিত্তিতে। মুসলিম লীগের দাবি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক সংলগ্নতা, বন্দর রক্ষা এবং জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে।
১৫ আগস্টের আগে এই বিরোধের সমাধান হয়নি। কংগ্রেস জানত, চাকমারাও জানত—তারা ভারতের অংশ হতে যাচ্ছে। কিন্তু ঘোষণা হলো না। চাকমারা মহাসমারোহে ভারতের পতাকা উত্তোলন করল।
১৬ আগস্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর বাসভবনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে, কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আর সরব হয়নি।
মাউন্টব্যাটেন সেদিনের সভা অসমাপ্ত রেখে উঠে যান। ১৭ আগস্ট ঘোষণা আসে—পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের ভাগে পড়েছে।
কারণটি কী?
সবাই জানে, দেশভাগের সূত্র ছিল হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বিভাজনের রেখা। কিন্তু এর বাইরে ‘অন্য কারণ’ বা other factors বলেও একটি বিষয় ছিল। সেটি হলো সংলগ্নতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক সংলগ্নতা ছিল মূল চট্টগ্রামের সঙ্গে।
বাংলার গভর্নর ফ্রেডেরিক ব্যারোজ তাঁর এক সুপারিশনামায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে চট্টগ্রামের তথা পাকিস্তানের সঙ্গে রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তি ছিল—পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, রাজস্ব সংগ্রহ ও বাণিজ্য—সবকিছুই চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দর না থাকলে এটি একটি স্থলবেষ্টিত এলাকায় পরিণত হবে। সীমান্তবিহীন ছিটমহলের বাসিন্দা হলে এর দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।
শেষমেশ মাউন্টব্যাটেন এই যুক্তি মেনে নেন এবং ১৭ আগস্ট ঘোষণা দেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের ভাগে পড়েছে। এতে চাকমারা মুষড়ে পড়েন।
কিন্তু চাকমা সমাজের প্রবীণ বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী ড. মানিকলাল দেওয়ান পূর্ব বাংলায় অন্তর্ভুক্তিকে ‘শাপে বর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একসময় ভারতে অন্তর্ভুক্তি আন্দোলনের নেতা কামিনী মোহন দেওয়ানও স্বীকার করেন, ‘হিন্দুস্থানভুক্ত হইলে আমরা সহস্র অসুবিধার সম্মুখীন হইতাম। এই জেলা হিন্দুস্থানভুক্ত হইলে পাকিস্তানের ভিতর দিয়া ভিন্ন বহির্জগতের বাসিন্দাদের সঙ্গে মিশিবার রাস্তাও আমাদের নাই... ভগবান যাহা করেন, তাহা মঙ্গলের জন্য করেন।’
এখন ভারতের এবং এদেশীয় কিছু চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অংশ করার জন্য নানাবিধ তৎপরতায় লিপ্ত। আদিবাসী বিতর্ক, অখণ্ড ভারত আন্দোলন, ১৭ আগস্ট কালো দিবস পালন—সবই যেন একই সূত্রে গাঁথা।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment