বাংলাদেশ নিয়ে সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর গল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—তিনি ঘটনা বলেন না, ঘটনার ওপর আগে থেকে বানানো একটি সিদ্ধান্ত বসিয়ে দেন।
কোথাও একজন হিন্দু নিহত হলেই সেটি হয়ে যায় “হিন্দু নিধন”। কোথাও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠলেই সেটি হয়ে যায় “রাষ্ট্রীয় হিন্দুবিদ্বেষ”। কোনো মামলায় একজন হিন্দু নেতা অভিযুক্ত হলেই সেটি হয়ে যায় “হিন্দু হওয়াই অপরাধ”। আর ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান? সেটিও তাঁর ভাষায় “jihadist coup”।
কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামে জাতীয় পতাকার ওপর গেরুয়া পতাকা তোলার অভিযোগে। মামলায় মোট ১৯ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগটি সত্য কি মিথ্যা—সেটা আদালতের বিষয়। কিন্তু “হিন্দু বলে মামলা” বলা আর “জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে মামলা” বলা একই কথা নয়। অভিযোগকে বিচার ছাড়াই খারিজ করে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকেই চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করাও ঠিক নয়।
দিপু চন্দ্র দাসের ঘটনা নিশ্চয় বর্বরতা, এবং এর বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু তদন্তে RAB বলেছে, তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। অর্থাৎ সত্যটা হলো—একজন হিন্দু শ্রমিককে ভয়াবহভাবে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু সেই হত্যাকে প্রমাণ ছাড়াই “রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দু নিধনের প্রমাণ” বানিয়ে ফেলা আরেক ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার।
রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনাও একইভাবে ভয়াবহ। কিন্তু পুলিশের তদন্তে গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে যে তথ্য এসেছে, তাতে ইয়াবা সেবন, বাড়ির ছাদে প্রবেশ এবং শ্বাসরোধের কথা রয়েছে। তদন্তকারীরা সেই বক্তব্য ফরেনসিক ও DNA পরীক্ষায় যাচাই করছিলেন। সন্দেহভাজন দুজনও হিন্দু। এখন তদন্তের ফল বের হওয়ার আগেই যদি ঘটনাটিকে “সাম্প্রদায়িক নিধন” বলে চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়, তাহলে সেটি কি সত্য অনুসন্ধান, নাকি রাজনৈতিক narrative তৈরি?
সমস্যাটা এখানেই।
শোয়েব চৌধুরীর লেখায় ৫ আগস্টের ঘটনাকে “jihadist coup” বলা হয়েছে। ইউনূস সরকারকে ইসলামপন্থীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখানো হয়েছে। শোয়েব চৌধুরীর বয়ানে বাংলাদেশকে ক্রমাগত এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আঁকা হচ্ছে যেখানে হিন্দুদের কোনো অধিকার নেই, জিহাদিরা রাষ্ট্র দখল করেছে এবং দেশ পাকিস্তান বা সোমালিয়ার দিকে যাচ্ছে।
এই বয়ানের শক্তি হলো—এটি বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করে না; বরং বাস্তব ঘটনার সঙ্গে নিজের ব্যাখ্যাকে এমনভাবে জুড়ে দেয় যে পাঠকের কাছে দুটো আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।
হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা আছে—তাই বলে প্রতিটি ঘটনা হিন্দু নির্যাতন নয়।
মব লিঞ্চিং হয়েছে—তাই বলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড নয়।
একজন হিন্দু নেতা জেলে আছেন—তাই বলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচারিক প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না।
আর বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতি আছে—তাই বলে ৫ আগস্টের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাকে “জিহাদি ক্যু” বলা কোনো প্রমাণিত সত্য হয়ে যায় না।
একজন সাংবাদিক বা লেখকের কাজ হওয়া উচিত ঘটনার স্তরগুলো আলাদা করা—কী ঘটেছে, কে বলেছে, তদন্ত কী বলছে, আদালত কী বলছে এবং কোথায় এখনো অনিশ্চয়তা আছে।
কিন্তু যখন প্রতিটি ঘটনার শেষে একই সিদ্ধান্ত যদি বেরিয়ে আসে—“বাংলাদেশ জিহাদি রাষ্ট্র, হিন্দুরা নিপীড়িত, সরকার জিহাদিদের দোসর”—তখন প্রশ্ন উঠবেই:
তিনি কি বাংলাদেশের ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করছেন, নাকি বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট ছবি পশ্চিমা দর্শকের সামনে তৈরি করছেন?
কারণ একটি দেশের দুর্বলতা, অপরাধ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে সত্যভাবে তুলে ধরা আর সেই দুর্বলতাগুলোকে ব্যবহার করে একটি গোটা দেশের বিরুদ্ধে স্থায়ী রাজনৈতিক narrative তৈরি করা—দুটো এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশে প্রত্যেকটা অপরাধের বিচার চাই।
হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা চাই।
গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই।
কিন্তু একই সঙ্গে চাই—ঘটনাকে ঘটনা হিসেবে বলা হোক, অনুমানকে অনুমান হিসেবে, আর রাজনৈতিক প্রচারণাকে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবেই চিহ্নিত করা হোক।
কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু মিথ্যা নয়।
অর্ধসত্যও।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment