আজ যারা চিন্ময়ের প্যারোলে মুক্তি নিয়ে কান্নাকাটি করছেন, তাদের কি আলী আজমের কথা মনে আছে?

0


আজ যারা চিন্ময়ের প্যারোলে মুক্তি নিয়ে কান্নাকাটি করছেন, তাদের কি আলী আজমের কথা মনে আছে? 

২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর। গাজীপুরের কালিয়াকৈর। বোয়ালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম মায়ের জানাজা পড়াচ্ছেন। হাতে হাতকড়া। পায়ে ডান্ডাবেড়ি।

মা সাহেরা বেগম বার্ধক্যে মারা গেছেন দুই দিন আগে। ছেলে তখন কারাগারে—বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের এক মামলায়, সাজা হয়নি, বিচারাধীন হাজতি। শেষবার মাকে দেখতে ও জানাজা পড়াতে প্যারোল চাওয়া হয়। মঞ্জুর হয় তিন ঘণ্টা।

তিন ঘণ্টায় বাড়ি যাওয়া, জানাজা, দাফন, আবার কারাগার। পুরো সময় হাতকড়া খোলা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক অনুরোধ করা হয়েছিল। মুসল্লিরাও বলেছিল কিন্তু খোলা হয়নি। হাতকড়া পরা অবস্থায় অজু করতে হয়েছিল,  জানাজার ইমামতি করতে হয়েছে শিকল পরে। 

সেই ছবি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বলে, এটা অমানবিক, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, হাইকোর্টের নির্দেশনা মানা হয়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্র নিন্দা জানায়। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ নিজেই বলেন, জানাজার সময় হাতকড়া-ডান্ডাবেড়ি খুলে দিলে ভালো হতো। তারপরও কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার খবর মেলেনি।

কারা কর্তৃপক্ষের জবাব ছিল একটাই—জেল কোড। প্যারোলে গেলেও হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি লাগবে। নয়জন পুলিশ পাহারায় ছিল। তবু শিকল খোলা হয়নি।

আলী আজম পরে জামিনে বেরোন। কারাভোগ ছিল এক মাস নয় দিন। হাইকোর্টে রিট হয়। আদালত হাতকড়া-শিকলের নীতিমালা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে রুল জারি করে। ঘটনার মানবিক দাগ সেখানেই থেমে যায়নি। 

এখন একটা কঠিন সত্য কথা বলি- 

প্যারোলের যে নীতিমালা নিয়ে আজ বিতর্ক, সেটা ২০১৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার বদলেছিল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয় মঞ্জুর বা নাকচ করার। অসুস্থ আত্মীয় দেখার সাধারণ বিধান রাখা হয়নি। নিকটাত্মীয় মারা গেলে সীমিত সময়ের প্যারোল—এই কাঠামো সেই সময়ের। আলী আজমের তিন ঘণ্টা ও শিকল সেই আমলের প্রয়োগ। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের অসুস্থ মাকে দেখার আবেদন নাকচ এবং মৃত্যুর পর পাঁচ ঘণ্টা—সেই একই হাসিনা আমলের আইনে হয়েছে।

আজ যাঁরা পাঁচ ঘণ্টাকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রমাণ বানাচ্ছেন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন—২০২২-এ তিন ঘণ্টায় হাতকড়া-ডান্ডাবেড়ি পরে মায়ের জানাজা পড়ানোর সময় মানবিকতা কোথায় ছিল?

তখন কি জেল কোড মানবিক ছিল? তখন কি সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ কাজ করত না? তখন কি মায়ের শেষকৃত্য শুধু সময়ের হিসাব ছিল, মর্যাদার হিসাব ছিল না?

দুই ঘটনা এক নয়। আলী আজম স্থানীয় রাজনৈতিক মামলার বিচারাধীন নেতা। চিন্ময় রাষ্ট্রদ্রোহ ও পরবর্তী হত্যা মামলার আসামি, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কারাবন্দি। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও জানাজার সময়ের চাহিদাও আলাদা। 

কিন্তু আলী আজমের সময়ে আওয়ামী লীগের মন না কাঁদলেও আজ চিন্ময় এর বেলা তারা ঠিকই কান্নাকাটি করছে—। সেই যুক্তি ২০২২-এও প্রযোজ্য ছিল। তখন ক্ষমতায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নীতিমালা করেছেন, প্রয়োগ করেছেন, সমালোচনা শুনেও শিকল খুলেননি, তারাই আজ  প্যারোলের মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। 

মানবিকতা যদি নীতি হয়, তবে তা ক্ষমতায় থাকা দলের বন্দির জন্য এক রকম আর বিরোধীর জন্য অন্য রকম হতে পারে না। আলী আজমের জানাজা সেই উদাহরণ তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগ । চিন্ময়ের পাঁচ ঘণ্টা সেই তুলনায় নতুন নয়, পুরোনো আইনের প্রয়োগ। 


আইন সবার জন্যই সমান।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team