যে প্রশ্ন জনমনে- আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের ‘সমঝোতা’ গুঞ্জন!
আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট বা সমঝোতার সম্ভাবনা নেই—জামায়াতে ইসলামীর এই বক্তব্য যতটা কঠোর, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোও ততটাই অস্বস্তিকর। জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু বক্তব্যই শেষ কথা নয়; দলটির প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের খবরও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিষয়ে জামায়াতের কঠোর ভাষার পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে দৃশ্যমান রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং নতুন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
১ অক্টোবর ফেনীর ফুলগাজীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত’ রাজনৈতিক শক্তি আবার একসঙ্গে এসেছে। তিনি জনগণকে এ ধরনের রাজনীতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ; নিশ্চয় তিনি তথ্যসূত্র থেকেই কথাটি বলেছেন। এর আগেও কিছু কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে জামায়াতের নমনীয়তা দেখে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। কেননা জামায়াত এনসিপির কোনো সমাবেশে এমনকি লং মার্চেও আওয়ামী দুঃশাসনের কোনো চিত্র তারা জনসম্মুখে তুলে ধরেনি।
জামায়াতের ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি ছিল, কিন্তু জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো উল্লেখ ছিল না। এ নিয়ে বিএনপি ও অন্য মহলে প্রশ্ন ওঠে। জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের ব্যাখ্যা ছিল, প্রদর্শনীটি মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনের ইতিহাস তুলে ধরেছে এবং জিয়াউর রহমানকে তারা কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা করেন না। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পরও রাজনৈতিক প্রশ্নটি পুরোপুরি শেষ হয়নি—কারণ ইতিহাসের কোন অংশ সামনে আনা হবে, কোন অংশ বাদ যাবে, সেটিও একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ২০২৬ সালে জুলাই অভ্যুত্থান, গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়েছে। দলটি এখন শুধু রাজপথের আন্দোলনকারী শক্তি নয়; জাতীয় সংসদেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের ১২ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন; পরবর্তী প্রক্রিয়ায় জোটের মোট বরাদ্দ ১৩-এ দাঁড়ায়। ফলে তাদের কাছে এখন রাজপথের আন্দোলন এবং সংসদীয় রাজনীতির—দুই ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার দায় আরও বেশি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘গোপন সমঝোতা হয়েছে কি না’—শুধু এটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, জামায়াত কি একই সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিসর, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত এবং জুলাই-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক আবেগ—তিনটিকেই নিজের রাজনৈতিক বিস্তারের জন্য ব্যবহার করছে? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়, স্বচ্ছ রাজনৈতিক আচরণ, প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড দিয়েই দিতে হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা নেই—জামায়াতের এই অবস্থান আপাতত প্রকাশ্য হলেও কর্মকাণ্ডে কিন্তু তা প্রকাশ পাচ্ছে না। জামায়াতের এই অবস্থানের সঙ্গে তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।
অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বর্তমানের জোটনীতি এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী কৌশল—কোনোটিই অস্পষ্টতার আড়ালে থাকলে ‘সমঝোতা’ নিয়ে গুঞ্জন থামানো কঠিন। তাই অস্বীকারের পাশাপাশি জামায়াতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—কথা ও কাজের মধ্যে দৃশ্যমান সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment