কথিত বন্দিশালা: ইতিহাসকে ‘কথিত’ বানানোর সাহস কোথা থেকে আসে?

 


কথিত বন্দিশালা: ইতিহাসকে ‘কথিত’ বানানোর সাহস কোথা থেকে আসে?

হিটলারের পতনের পর কেউ কি সাহস পেয়েছিল অ্যাউশভিৎস বা অন্যান্য টর্চার চেম্বারকে ‘কথিত’ বলার? মুক্তিযুদ্ধের পর কেউ কি সাহস পেয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যা-ধর্ষণকে ‘কথিত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার? উত্তর একটাই—না। কারণ সেই সময় ইতিহাস এখনো কাঁচা রক্তে ভেজা ছিল। জাতি তখনও ক্ষতের যন্ত্রণায় ছটফট করছিল।

কিন্তু আজ বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। জুলাই অভ্যুত্থানের মাত্র এক বছর পরই গুমের মতো জাতির গভীর ক্ষতকে নিয়ে তামাশা শুরু হয়েছে। ‘আয়নাঘর’ বা অন্যান্য গোপন বন্দিশালার কথা উঠলেই অনেক গণমাধ্যম লিখছে—‘কথিত বন্দিশালা’। প্রথম আলোসহ একাধিক পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়া এই শব্দটি বারবার ব্যবহার করছে। একটা-দুটো নয়, অনেকেই।

এটা কি নিছক সাংবাদিক সতর্কতা? নাকি গদি মিডিয়ার মতো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নির্দেশ অনুযায়ী সমন্বিত ন্যারেটিভ নির্মাণ? প্রশ্নটা অমূলক নয়। কারণ একই সময়ে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর কোন কোন ভুল এই সাহস উৎপাদন করেছে, সেটা এখনই ভাবা দরকার। যদি আজ গুম, বন্দিশালা, নির্যাতনকে ‘কথিত’ বলা যায়—তাহলে কয়দিন পর জুলাইকেও ‘কথিত অভ্যুত্থান’ বলা হবে। সরকারকে ‘কথিত সরকার’, নির্বাচনকে ‘কথিত নির্বাচন’, এমনকি বাংলাদেশকেই ‘কথিত বাংলাদেশ’ বলা শুরু হবে।

ইতিহাস মুছে ফেলার এই প্রক্রিয়া আজ শুরু হয়েছে ছোট ছোট শব্দে। ‘কথিত’ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অস্বীকৃতির বীজ। যে জাতি নিজের ক্ষতকেই স্বীকার করতে দ্বিধা করে, সে জাতি আবারও একই ফাঁদে পা দেয়।

সাধু সাবধান। আজ যদি গুমের ক্ষতকে ‘কথিত’ বলা হয়, কাল জুলাইয়ের রক্তও ‘কথিত’ হয়ে যাবে।

জুলাইয়ের আবেগকে ধ্বংস করল কারা?


জুলাইয়ের আবেগকে ধ্বংস করল কারা?

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেল। যে আন্দোলনে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, সেই আবেগকে আমাদের স্মৃতি, হৃদয়ে, কর্মকাণ্ডে ধরে রাখার কথা ছিল। নিহতদের স্মরণে সভা-সমাবেশ, আহতদের পাশে দাঁড়ানো, শহীদ পরিবারের পাশে থাকা—এসবই হওয়ার কথা ছিল জুলাই জুড়ে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র।

মাসব্যাপী কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি চোখে পড়ল না। জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের স্মরণে কোনো বড় সমাবেশ, কোনো স্মৃতিসভা—কিছুই হয়নি। উল্টো এনসিপির পদযাত্রার নামে অনুষ্ঠানে বিএনপিকে গালিগালাজ, প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি—এসবই চোখে পড়ল। কোন্দল বাধানো, দোষারোপ করা, নিজেদেরকে একমাত্র মালিক সাজানো—এই কর্মকাণ্ডই বেশি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে- যারা জুলাইয়ের নাম ভাঙিয়ে আজ রাজনীতি করছেন, তারাই কি এই আবেগকে ধ্বংস করছেন? 

অভ্যুত্থানের সময় যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, যে আবেগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটাকে এখন দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ চলছে। যারা আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের কথা কেউ মনে রাখছে না। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্মৃতিও যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

জুলাইয়ের আবেগ ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের আবেগ। আর এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪। যার বড় অবদান বিএনপির। কিন্তু সেই অবদানকে অস্বীকার করে এনসিপি এটিকে একটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কোন্দলে নামিয়ে এনেছে। পদযাত্রার মঞ্চ থেকে বিএনপিকে আক্রমণ করা, প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি দেওয়া—এসব কি জুলাইয়ের চেতনা? নাকি জুলাইকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা?

যারা জুলাইয়ের নামে কথা বলেন, তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে—আবেগকে ধ্বংস করল কারা? শহীদদের স্মৃতি কি শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই সম্মান জানানো হবে? প্রশ্নটা আজকের বাস্তবতায় খুবই জরুরি।

স্কুলের বেঞ্চে বসা ছেলেরা আজ বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে

স্কুলের বেঞ্চে বসা ছেলেরা আজ বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে

আজকের নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী—এই চারজন এখন রাজনীতির ময়দানে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তারাই দেশের একমাত্র সংগ্রামী শক্তি। বিএনপির নেতাদের উদ্দেশে ‘তুই’, ‘তোর’ করে কথা বলা, হুমকি দেওয়া, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও গালিগালাজ করা—এসব এখন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই চারজনের জন্মই হয়েছে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে।

বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে। জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, তখন এই চারজনের বাবা-মায়েরও হয়তো বিয়ে হয়নি। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি যে নয় বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছে, সেই সময় তারা মায়ের পেটেও ছিলেন না। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির নেতৃত্বে যে স্বৈরাচারের পতন হয়, তখনও তাদের অস্তিত্ব ছিল না। সেই আন্দোলনে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, আজকের এই চার নেতার বাবা-মায়ের বয়সী মানুষ।

পরে ১৯৯৬ থেকে ২০০১, আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪—বিএনপি টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজপথে লড়েছে। গুম, খুন, মামলা, নির্যাতন—সব সহ্য করে। ২০১০ সালে খালেদা জিয়ার সামরিক বাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে হরতাল ডাকা হয়। তখন নাহিদ, সারজিস ও হাসনাতের বয়স মাত্র ১২। ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে টানা হরতাল-অবরোধ চলে, নির্বাচন বয়কট হয়। তখনও তারা স্কুল-কলেজের ছাত্র। ২০১৫ সালে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে যে টানা অবরোধ চলে, যেখানে পেট্রোল বোমা আর সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ মারা যায়—তখনও তারা কলেজপড়ুয়া কিশোর। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর পর বিএনপির কর্মীরা রাজপথে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ঘুরত।

আজ সেই একই বিএনপির নেতাদের ‘তুই’ বলে ডাকছে। বাপের বয়সী মানুষকে অপমান করে নিজেদেরকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়া ‘জুলাইর মুখ’ সাজাচ্ছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল না। তারা যেন হঠাৎ করেই ইতিহাসের মালিক হয়ে গেছেন। যারা ১৫-২০ বছর ধরে রাজপথে লড়েছেন, তাদেরকেই এখন ‘পুরনো রাজনীতির প্রতিনিধি’ বলে অবজ্ঞা করা হচ্ছে।

ইতিহাস মুছে ফেলে নিজেদেরকে বীর বানানোর এই প্রচেষ্টা কি স্যাটায়ার নয়? নাকি এটাই আজকের রাজনীতির নতুন ধরন—যারা লড়াই করেছে, তাদেরকেই অপমান করা, আর যারা লড়াইয়ের সময় স্কুলে ছিল, তারাই এখন নেতৃত্ব দাবি করে বসছে? প্রশ্নটা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে।

বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে, অথচ নিজের জন্মের আগের ইতিহাস জানে না


বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে, অথচ নিজের জন্মের আগের ইতিহাস জানে না

আজকের নাহিদ, সারজিস, হাসনাত আর পাটওয়ারী এখন রাজনীতির ময়দানে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তারাই দেশের একমাত্র সংগ্রামী। বিএনপির নেতাদের উদ্দেশে ‘তুই’ ‘তোর’ করে কথা বলা, হুমকি দেওয়া, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও গালিগালাজ করা—এসব এখন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। অথচ এই চারজনের জন্মই হয়েছে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে।

বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে। জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, তখন এই চারজনের বাবা-মায়েরও হয়তো বিয়ে হয়নি। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি যে নয় বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছে, সেই সময় তারা মায়ের পেটেও ছিলেন না। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির নেতৃত্বে যে স্বৈরাচারের পতন হয়, তখনও তাদের অস্তিত্ব ছিল না।

পরে ১৯৯৬ থেকে ২০০১, আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪—বিএনপি টানা দেড় দশক ধরে রাজপথে লড়েছে। গুম, খুন, মামলা, নির্যাতন—সব সহ্য করে। ২০১৩-১৫ সালের টানা হরতাল-অবরোধে যখন শতাধিক মানুষ মারা যায়, তখন এই চারজন স্কুলের ইউনিফর্ম পরে ক্লাসে বসত। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর পর বিএনপির কর্মীরা রাজপথে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ঘুরত।

আজ সেই একই বিএনপির নেতাদের ‘তুই’ বলে ডাকছে। বাপের বয়সী মানুষকে অপমান করে নিজেদেরকে ‘জুলাইর মুখ’ সাজাচ্ছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের আগে, জুলাই প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে তাদের কোনো অবদান ছিল না। তারা যেন হঠাৎ করেই ইতিহাসের মালিক হয়ে গেছেন।

ইতিহাস মুছে ফেলে নিজেদেরকে বীর বানানোর এই প্রচেষ্টা কি স্যাটায়ার নয়? নাকি এটাই আজকের রাজনীতির নতুন ধরন—যারা লড়াই করেছে, তাদেরকেই অপমান করা, আর যারা লড়াইয়ের সময় স্কুলে ছিল, তারাই এখন নেতৃত্ব দাবি করে বসছে?

যখন তারা স্কুলে পড়ত, তখন বিএনপি রাজপথে লড়ছিল


যখন তারা স্কুলে পড়ত, তখন বিএনপি রাজপথে লড়ছিল

আজকের নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী—এই চারজন এখন জুলাই অভ্যুত্থানের মুখ, এনসিপির শীর্ষ নেতা। কিন্তু এক যুগ আগে তারা কেউ রাজনৈতিক ময়দানে ছিলেন না। তারা তখন স্কুল-কলেজের ছাত্র, কেউ কেউ একেবারে শিশু-কিশোর।

২০১০ সালে খালেদা জিয়ার সামরিক বাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে বিএনপি সারা দেশে হরতাল ডাকে। তখন নাহিদ, সারজিস ও হাসনাতের বয়স মাত্র ১২। পাটওয়ারী ছিলেন ১৫। ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি টানা হরতাল-অবরোধ করে, নির্বাচন বয়কট করে। তখন এই চারজনের বয়স ১৫ থেকে ১৮। ২০১৫ সালে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে যে টানা অবরোধ চলে, যেখানে পেট্রোল বোমা আর সংঘর্ষে শতাধিক প্রাণহানি হয়—তখনও তারা কলেজপড়ুয়া কিশোর।

বিএনপি সেই সময় রাজপথে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। নেতাকর্মীদের গুম, হত্যা, মামলা আর নির্যাতনের মুখে দলটি একের পর এক কর্মসূচি দিয়েছে। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পরও প্রতিবাদ হয়েছে। তখন এই চারজনের বয়স ১৯-২২। তারা তখনও ছাত্রজীবনে ব্যস্ত।

আর এখন, ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর, এই চারজনই নিজেদেরকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প বলে নিজেদের হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। বিএনপি যে লড়াইটা ১৫ বছর ধরে একা করেছে, তার ফল ভোগ করার দাবিদার হয়ে উঠেছেন তারা। কিন্তু ইতিহাস বলে—যখন বিএনপি রাজপথে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন এই নেতারা স্কুলের বেঞ্চে বসে ছিলেন।

রাজনীতি করতে গেলে ইতিহাস জানতে হয়, ইতিহাস পড়তে হয়, হতে হয় ইতিহাসের ছাত্র। নাহিদ হাসনাত সার্জিস পাটোয়ারীদের একথা কে বুঝাবে?

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team