হাইকমিশনার নাকি শ্বশুরবাড়ির জামাই?

হাইকমিশনার নাকি শ্বশুরবাড়ির জামাই?

দিনেশ ত্রিবেদী সাহেব বাংলাদেশে আসার পর মনে হচ্ছে, তিনি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে আসেননি—শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছেন! 😄

একটার পর একটা বৈঠক, সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দেখা, মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে আলোচনা, সংসদে যাতায়াত—কোথাও যেন তাঁর ব্যস্ততার শেষ নেই!

আমাদের বাংলাদেশি হাইকমিশনার ভারতে গিয়ে এতটা দৌড়ঝাঁপ করার সুযোগ পান কি না, সেটা অবশ্য আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু ত্রিবেদী সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে তাঁর অ্যাক্টিভিটি লেভেল একটু বেশিই হাই!

সকালবেলা মন্ত্রী, দুপুরে রাজনৈতিক নেতা, বিকেলে সংসদ, সন্ধ্যায় আরেক বৈঠক, ছুটির দিনে ইয়োগা করছেন- এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো দেখা যাবে:

“আজ হাইকমিশনার সাহেব কোন মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছেন?”
—“জানি না ভাই, আগে উনার পিএসকে জিজ্ঞেস করেন!” পিএস হয়তো বলবেন শিডিউল ঠিক নাই।  😂

কূটনীতিতে যোগাযোগ অবশ্যই দরকার। দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা দরকার। কিন্তু একজন বিদেশি হাইকমিশনারের এত ঘনঘন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আনাগোনা দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—

উনি কি বাংলাদেশে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন, নাকি আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সামাজিকতা করতে এসেছেন?

এমনকি মনে হচ্ছে, আর কয়েকদিন থাকলে হয়তো সংবাদ আসবে—

“ত্রিবেদী সাহেব আজ শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং রাতে পারিবারিক নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন।” 😆

বেশি সক্রিয় ত্রিবেদি সাহেব সব অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ঠিকঠাক অনুমতি নেন তো? নাকি সরাসরি গিয়ে হাজির হন? 

হাইকমিশনার সাহেব হয়তো ভুলে গেছে কেবল কূটনৈতিক কাজেই তিনি বাংদেশে নিয়োগপ্রাপ্ত। এত দৌড়ঝাপ করতে করতে দেখা গেল তিনি আবার কবে না নাকগলানো শুরু করেন। 

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বনাম ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন

 বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বনাম ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন

বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। পূজা, বড়দিন কিংবা বুদ্ধপূর্ণিমা—উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারও শামিল হয় আনন্দে। এই সহাবস্থান কোনো আরোপিত নীতি নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত এক বাস্তবতা।

মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটে— কিন্তু প্রতিটি ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সম্পত্তি বিরোধের মতো কারণ, ধর্মীয় নিপীড়নের কোনো সংগঠিত রূপ নয়। রংপুরের ঘটনায় তো অপরাধীরাই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী—যা প্রমাণ করে এটি সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া এগিয়েছে।

এর বিপরীতে ভারতের চিত্র ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত, আদিবাসী—একাধিক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। জাতিসংঘের সিইআরডি কমিটি সরাসরি সতর্ক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন নিয়ে। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ৮৩০টি হামলার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৩৯টিতে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাভাষী মুসলিমদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সীমান্তের ওপারে।

এই তুলনা থেকে যে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়, তা হলো—বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দাঁড়ায়, ভারতে অভিযোগের কেন্দ্রেই থাকে রাষ্ট্র নিজে। 

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের গতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'মুসলিম মিরর'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু গত জুন মাসের আগের দেড় মাসে বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ২৩টি মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এর বড় অংশই ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে। এর আগে উত্তর প্রদেশে একাই প্রায় তিনশোর কাছাকাছি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার খবর উঠে আসে।

পশ্চিমবঙ্গে এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। নির্বাচনের আগে থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রকাশ্য জনসভায় রাজ্য সরকার পরিবর্তনের ডাক দেন এবং অভিযোগ তোলেন যে তৃণমূল সরকার সীমান্তে বেড়া নির্মাণে বাধা দিয়ে "অনুপ্রবেশকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল" তৈরি করেছে। নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই সেপ্টেম্বরে সামনে আসে আরেকটি বিতর্ক—রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগের নির্দেশে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ ও মাজারগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে, একুশ দফা ফরম পূরণ করিয়ে। রাজ্যজুড়ে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়, এমনকি রাজ্য সরকার আগে হাইকোর্টকে জানিয়েছিল—এমন কোনো নির্দেশ তারা দেয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংসদেও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এক সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি বলেন—"ভারতে যে হারে মসজিদ ভাঙা হয়, বাংলাদেশে কি সে হারে মন্দির ভাঙা হয়?"—এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। 

কারণ ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুদের সবচেয়ে বড় শারদীয় ‍পুজা অনুষ্ঠিত হয়। আর উৎসবের এই সময়টাকেই বেছে নিয়ে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায় একটি চক্র। গুজব ছড়ানো, উসকানিমূলক পোস্ট, মিথ্যা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া—এসব ষড়যন্ত্র প্রায়ই আসে সীমান্তের ওপার থেকেও, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাই প্রশাসন, গণমাধ্যম আর সাধারণ মানুষ—সবাইকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। কোনো গুজবে কান না দিয়ে, কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

কিশোর গ্যাং: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক ভয়ংকর বাস্তবতা

 কিশোর গ্যাং: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক ভয়ংকর বাস্তবতা

কিশোর গ্যাং এখন বাংলাদেশের নগর জীবনের অন্যতম উদ্বেগের নাম। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, জমি দখল থেকে হত্যাকাণ্ড—অপরাধের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু এই সংকটকে শুধু কিছু কিশোরের অপরাধপ্রবণতা হিসেবে দেখলে এর গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর ও তরুণদের অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক নিয়ে পুলিশ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও গবেষণায় একাধিক তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের মার্চে ডিবি পুলিশ জানিয়েছিল, ঢাকার কিছু সাবেক ও বর্তমান কাউন্সিলর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছেন। একই সময়ে ডিএমপি কর্মকর্তারা বলেন, কয়েকটি গ্যাং রাজনৈতিক ব্যক্তি ও কাউন্সিলরদের সমর্থন পাচ্ছে। এপ্রিল মাসে ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপের কারণে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং এসব প্রভাবশালীর অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এই জায়গাতেই গত দেড় দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। রাজনীতিতে পেশিশক্তি ও স্থানীয় আধিপত্যের জন্য তরুণদের ব্যবহার করা হলে তাদের মধ্যে অপরাধের প্রতি ভয় কমে এবং রাজনৈতিক পরিচয় এক ধরনের সুরক্ষার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তরুণদের সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় বিরোধে যুক্ত হওয়ার প্রণোদনা দিতে পারে। তবে একই গবেষণা পরিবার, দারিদ্র্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অভিভাবকীয় দুর্বলতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ব্যবস্থার পরিণতি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ‘বড় ভাইয়ের’ ছত্রচ্ছায়ায় যে কিশোর অপরাধে হাতেখড়ি নেয়, সময়ের সঙ্গে সে নিজেই এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। মোহাম্মদপুর নিয়ে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও ২০০৯ সালের পর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্কে পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে।

অতএব কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কিশোরকে গ্রেপ্তার করা সহজ; কঠিন হলো তার পেছনের ‘বড় ভাই’, অর্থের উৎস এবং পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা অন্তত এই প্রশ্নটি সামনে এনেছে—রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন অপরাধী নেটওয়ার্ককে আশ্রয় দেয়, তখন তার সর্বশেষ পরিণতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; তা একটি প্রজন্মের অপরাধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করে।

কিশোর গ্যাং অপ্রতিরোধ্য: ১৫ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়াবহ উত্তরাধিকার

কিশোর গ্যাং অপ্রতিরোধ্য: ১৫ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভয়াবহ উত্তরাধিকার

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন আর শুধু ঢাকার কয়েকটি মহল্লার সমস্যা নয়। রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরেও কিশোর-তরুণদের সংঘবদ্ধ অপরাধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনা সামনে আসছে। কুমিল্লার সাম্প্রতিক অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সেই বাস্তবতারই ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী একজন এবং দুই কিশোরসহ একাধিকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অপ্রতিম হত্যার ভয়াবহতা শুধু একটি শিশুর নির্মম মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। তদন্তে উঠে এসেছে, সে একা নয়, বরং বয়সে বড় একদল তরুণের সঙ্গে চলাফেরা করছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় তাকে মাথায় আঘাত করা হয়। পরবর্তী অনুসন্ধানে পাঁচ হাজার টাকা দেনা, অসম বয়সী বন্ধুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির মতো আরও কিছু বিষয়ও সামনে এসেছে। অর্থাৎ একটি অপরাধের পেছনে শুধু লোভ নয়, রয়েছে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ যেখানে কিশোরদের সঙ্গে অপরাধপ্রবণ তরুণদের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।

এই প্রবণতাকে শুধু ‘বখে যাওয়া কিশোর’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে মূল সংকটটি ধরা পড়বে না। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি এবং পেশিশক্তির ব্যবহার নিয়ে বহু অভিযোগ ও অনুসন্ধান হয়েছে। ঢাকায় পুলিশ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের যোগাযোগের অভিযোগও উঠে এসেছে। এর ফলে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—যেখানে অপরাধী হওয়ার আগে কিশোর শিখছে ক্ষমতার ছায়ায় কীভাবে ভয় দেখাতে হয়।

তবে এটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সমস্যা হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো, পরিবারে নজরদারির ঘাটতি, মাদক, বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং স্থানীয় আধিপত্যের সংস্কৃতি—সবকিছু মিলেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পরিবেশ তৈরি করে। কুমিল্লায় চলতি বছরই মাদক ও এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, রাজনৈতিক পালাবদল হলেও যদি পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি বদলে না যায়, তাহলে গ্যাংয়ের কাঠামোও সহজে ভাঙবে না। আশ্রয়দাতা বদলাতে পারে, কিন্তু অপরাধের মডেল থেকে যেতে পারে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হত্যার ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—যে সমাজ কিশোরের হাতে অপরাধের অস্ত্র তুলে দেয়, সেই সমাজ কি শুধু কিশোরকে শাস্তি দিয়ে নিরাপদ হতে পারে? উত্তর খুঁজতে হলে কিশোরের পাশাপাশি তার পেছনের ‘বড় ভাই’, অর্থের উৎস, অস্ত্রের জোগান এবং যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ককেও আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে অপ্রতিমের মতো আরও কোনো শিশুর জীবনই হয়ে উঠতে পারে এই সংস্কৃতির পরবর্তী নির্মম পরিণতি।

আওয়ামী লীগ ভাবে—দিল্লিই তাদের আবার ক্ষমতায় বসাবে!

 আওয়ামী লীগ ভাবে—দিল্লিই তাদের আবার ক্ষমতায় বসাবে!

কিন্তু বাস্তবতা হলো—

 বাংলাদেশের ক্ষমতার চাবি দিল্লির হাতে নেই।

 চাবি বাংলাদেশের জনগণের হাতে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল।

 আর সেই আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল ভয়াবহ মাত্রায়।

জাতিসংঘের তদন্ত বলছে—

 নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে।

 হয়েছে নির্বিচার আটক ও নির্যাতন।

 জাতিসংঘের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১,৪০০ জন। 

 তদন্তে এসব ঘটনাকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই অভিযোগের রাজনৈতিক ও আইনি দায় এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনা ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত হয়েছেন।

তারপরও দিল্লি থেকে বার্তা—

 তিনি দেশে ফিরবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—

 ফিরবেন কী নিয়ে?

শুধু পুরনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে?

নাকি কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে? 

আওয়ামী লীগ যদি মনে করে দিল্লির সমর্থনই তাদের প্রত্যাবর্তনের রাস্তা খুলে দেবে,

 তাহলে সেটাই হয়তো তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল হিসাব।

কারণ ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে—

 কিন্তু সেটাকে বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বলা যায় না।

আর বিদেশের মাটি থেকে ঘোষণা দিলেই

 দেশের মানুষের আস্থা ফিরে আসে না।

আওয়ামী লীগের সামনে তাই প্রথম প্রশ্ন ক্ষমতায় ফেরা নয়।

প্রথম প্রশ্ন—

 ২০২৪-এর রক্তপাতের জবাবদিহি কী?

দ্বিতীয় প্রশ্ন—

 যে জনগণ তাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, সেই জনগণের কাছে তারা কী জবাব দেবে?

আর তৃতীয় প্রশ্ন—

 বাংলাদেশের মানুষ যদি তাদের প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দিল্লি কি সেই সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারবে?

পারবে না।

কারণ একটি দলের ক্ষমতায় ফেরার বৈধ রাজনৈতিক ভিত্তি কোনো বিদেশি রাজধানী নয়—

 বাংলাদেশের জনগণের ভোট এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

তাই আওয়ামী লীগের জন্য বার্তাটা পরিষ্কার—

দিল্লির ওপর রাজনৈতিক ভরসা নয়।

 আগে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। 

হতে হবে বিচারের মুখোমুখি। তারপর ফেরা না ফেরা। 

 হুমকি, ষড়যন্ত্র ও গুজব ছড়িয়ে বাংলাদেশের রাজধানীতে ফেরা এত সহজ নয়।

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team