আওয়ামী লীগ ভাবে—দিল্লিই তাদের আবার ক্ষমতায় বসাবে!

আওয়ামী লীগ ভাবে—দিল্লিই তাদের আবার ক্ষমতায় বসাবে!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে—আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আশা কি এখন ঢাকার রাজপথের চেয়ে দিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর বেশি নির্ভরশীল?

৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ কার্যত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে, দলীয় কার্যক্রমও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের একটি অংশের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই সামনে এসেছে।

এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ফলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ মনে করতে পারে, ভারতের কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।

কিন্তু এখানেই বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যাশার পার্থক্য।

ভারত বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তি হলেও কোনো দেশের সরকার গঠন শেষ পর্যন্ত সেই দেশের জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। দিল্লি কোনো দলকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করলেও বাংলাদেশের জনগণের ভোটের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।

তাই আওয়ামী লীগের সামনে মূল প্রশ্ন—তারা কি আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করবে, নাকি দেশের জনগণের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে?

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে হাসিনা যেমন কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার লঙ্ঘন করছে, তেমনি তার ক্রমাগত হুমকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরাকে দুরুহ করে ফেলছে। 

হাসিনার জানা উচিত ভারতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও আমেরিকা সাফ জানিয়ে দিয়েছে- হাসিনার প্রত্যবর্তন বাংলাদেশ ও ভারতের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং আওয়ামী লীগ যেমনটা ভাবছে ‘দিল্লিই তাদের ক্ষমতায় বসাবে’ এমন চিন্তা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।  

তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দিল্লির ভূমিকা ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শেষ পর্যন্ত সেই হিসাবের চূড়ান্ত উত্তর আসবে বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনগণের সিদ্ধান্ত থেকেই।

‘হিন্দু নির্যাতনের ভিডিও’—সত্য ঘটনা কতটা, আর রাজনৈতিক প্রচারণা কতটা?

 ‘হিন্দু নির্যাতনের ভিডিও’—সত্য ঘটনা কতটা, আর রাজনৈতিক প্রচারণা কতটা?

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলা বা নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা নেই, বিচ্ছিন্ন দু একটি ঘটনা যা ঘটে তা সংখ্যালঘু ফ্রেম দিয়ে নিউজ বানায় কেউ কেউ এটা সত্য । কিন্তু সেই বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে পুরোনো, ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে নতুন করে ‘হিন্দু নির্যাতন’ হিসেবে হাজির করাও এখন একটি পরিচিত অপপ্রচার কৌশল। ২০২৬ সালেই মহারাষ্ট্রের ভিডিওকে ঢাকায় হিন্দু তরুণ নির্যাতন, সুনামগঞ্জের স্কুলে আগুনকে দুর্গামন্দিরে হামলা, ফেনীর ডাকাতির ঘটনাকে হিন্দু নারীর ওপর ইসলামপন্থীদের নির্যাতন এবং দুই বছরের পুরোনো মিছিলকে সাম্প্রতিক পূজা বন্ধের হুমকি হিসেবে ছড়ানোর একাধিক উদাহরণ পাওয়া গেছে।

এই অপপ্রচারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—একটি সত্যিকারের সংখ্যালঘু-নিরাপত্তার উদ্বেগকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো। সম্প্রতি আওয়ামী লীগপন্থী কিছু অ্যাকাউন্ট বা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রচারমাধ্যমের ক্ষেত্রে এমন বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের উদাহরণ যাচ্ছে।  বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং সাইট বলছে, বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সীমান্তপারের কিছু নেটওয়ার্ক একই ধরনের পুরোনো ভিডিও, খন্ডিত বক্তব্য ও ভুল ক্যাপশন ব্যবহার করে সংখ্যা লঘু নির্যাতনের ইস্যু বানাচ্ছে।

আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত: হিন্দুদের নিরাপত্তার কথা বলার নামে কে সত্য তুলে ধরছে, আর কে পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনা বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে? ভিডিওটি কবে ধারণ করা, কোথায় ধারণ করা, মূল উৎস কী এবং স্থানীয় সংবাদে ঘটনাটির অস্তিত্ব আছে কি না—এই চারটি প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ভিডিওকে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। 

সামনে পুজো। তাই হিন্দু নির্যাতনের খবর এলেই বিশ্বাস না করে যাছাই করুন আগে। 

৫ আগস্টের পর হিন্দু কার্ড: ভারত ও আওয়ামী লীগ এক ফ্রেমে, স্বার্থও এক

৫ আগস্টের পর হিন্দু কার্ড: ভারত ও আওয়ামী লীগ এক ফ্রেমে, স্বার্থও এক 

৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সংখ্যালঘু প্রশ্নটা আর শুধু স্থানীয় নিরাপত্তার বিষয় থাকেনি। সেটা হয়ে উঠেছে দুই পক্ষের রাজনৈতিক কার্ড। একদিকে ভারতীয় ডানপন্থী অ্যাকাউন্ট ও কিছু গণমাধ্যম, অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ—দুটোই “হিন্দু নির্যাতন”কে নিজেদের গল্পের কেন্দ্রে বসায়। উদ্দেশ্য আলাদা, ফুটেজ প্রায়ই একই।

৫ আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের সপ্তাহেই বিবিসি ভেরিফাই করে দেখায়, চট্টগ্রামের নবগ্রহ মন্দিরে আগুনের দাবি ছিল ভুল; আগুন লেগেছিল পাশের আওয়ামী লীগ অফিসে। লিটন দাসের বাড়ি পোড়ানোর ক্লিপ আসলে মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ির। ঝিনাইদহের শহিদুল ইসলাম হিরণ ও চাঁদপুরের সেলিম খান—দুজনই মুসলিম আওয়ামী লীগ নেতা—গণপিটুনির ভিডিও “বৃদ্ধ হিন্দুকে ফাঁসি” হয়ে ছড়ায়। কোহিনূর আখতারের আহত চেহারা “হিন্দু নারী ধর্ষণ” বনে যায়; তিনি কৃষক লীগের মুসলিম নেত্রী। নড়াইলের ২০২২ সালের হিন্দু বাড়িতে হামলা, রাঙামাটির মুসলিম দোকানের দুর্ঘটনাজনিত আগুন, খালেদা জিয়ার জানাজায় “জয় বাংলা” নিয়ে মারধর—সবই পরে “সাম্প্রতিক হিন্দু হামলা” হয়ে ফেরে। এসবের বড় অংশের উৎস ভারত। The Dissent-এর হিসাবে ২০২৬ এ নির্বাচনের আগের ৬০ দিনে ভারত-উৎস ৩৯টি ব্যাপক ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ায়; তার মধ্যে এআই ভিডিওও আছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সেই সময় পাঁচ হিন্দু নিহতের কথা বলেছিল, যাদের দুজন রাজনৈতিক কর্মী। সংখ্যাটা “গণহত্যা”র ক্যাপশনের চেয়ে অনেক ছোট।

আওয়ামী লীগ একই কার্ড উল্টো দিক থেকে খেলে। তাদের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বিবৃতি বলে, ৫ আগস্টের পর চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদোন্নতি বন্ধ, জমি-ব্যবসা দখল চলছে; প্রমাণ হিসেবে তোলা হয় রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী পরিবার হত্যা। ঘটনা বাস্তব—চারজনকে গলা টিপে মারা হয়। পুলিশের বয়ান ইয়াবা ও পুরনো জমি-বিরোধ; ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি। আওয়ামী লীগ সেটাকে রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বানায়, যাতে নিষিদ্ধ দলের প্রত্যাবর্তন “সংখ্যালঘুর রক্ষক” হয়ে ওঠে। চৈতালী চক্রবর্তীর মতো সমর্থকরা আলাদা করে মেক্সিকোর কার্টেল-হত্যা, আত্মহত্যা ও পুরনো মিছিল দিয়ে রাজনৈতিক নির্যাতনের গল্প বানায়।

দুর্গাপূজা সামনে। এই মৌসুমে দুই কার্ডই জেগে ওঠে। ভারতীয় নেটওয়ার্ক পুরনো মণ্ডপ-হামলা ও এআই ক্লিপ ছাড়বে, যাতে ঢাকাকে “হিন্দুদের জন্য অনিরাপদ” দেখানো যায়। আওয়ামী লীগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে “পতনের পর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন” বলে তুলবে, যাতে নিজেদের পতনকে সংখ্যালঘুর বিপদ হিসেবে বিক্রি করা যায়। দর্শকের কাজ তিনটি: ভিডিওর তারিখ, ভুক্তভোগীর পরিচয়, ক্যাপশন কে লিখেছে। পূজা নির্বিঘ্নে হলে কিংবা শান্ত থাকলেও হিন্দু কার্ডের মৌসুম আগেই শুরু হয়—ভারতের প্রচারে, আওয়ামী লীগের ফ্রেমে। 

বাংলা ইনসাইডার পোর্টাল বন্ধু কিন্তু ইউটিউবে চলছে বোরহান কবীরের নতুন বয়ানকারখানা

বাংলা ইনসাইডার পোর্টাল বন্ধু কিন্তু ইউটিউবে চলছে বোরহান কবীরের নতুন বয়ানকারখানা

একটা সময় বাংলা ইনসাইডারে আজগুবি সব নিউজ ছাপতেন সৈয়দ বোরহান কবীর। উদ্ভট ও গুজব ছড়ানোর জন্য তার জুড়ি মেলা ভার। আওয়ামী লীগের পতনের পর আবারও নতুন ফ্রেমে বোরহান কবীর। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত তিনি সাজ্জাদ কাদির ও নবনীতা চৌধুরীর ব্যক্তিগত অনলাইন চ্যানেলে টানা সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। বিষয়বস্তু ঘুরছে একই কক্ষপথে: ২৪-পরবর্তী গণমাধ্যম নাকি মুখোশ খুলেছে, শেখ হাসিনা ফিরলে মিডিয়া কী করবে, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানকে ঘিরে দরবারে নাকি উত্তেজনা। একটি ভিডিওর ভিউ দেড় লাখ ছাড়িয়েছে। বোরহান কবীরের নিউজ পোর্টাল বন্ধ, কিন্তু বয়ান চালু আছে।

২০১৭ থেকে তার সম্পাদনায় বাংলা ইনসাইডার চালাত ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেড। ওয়েব্যাক থেকে দ্য ডিসেন্ট অন্তত আঠারোটি প্রতিবেদন তুলেছে, যার বড় অংশ শেখ হাসিনার নামে কাল্পনিক আন্তর্জাতিক জরিপ। অস্তিত্বহীন ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর বরাতে হাসিনা বিশ্বের তৃতীয় সৎ সরকারপ্রধান, সবচেয়ে মিতব্যয়ী প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রিয়দের শীর্ষ দশে। ডেকিন ইউনিভার্সিটির ‘মানবতার চ্যাম্পিয়ন’ দাবি সংসদে পর্যন্ত ওঠে। হাসিনার নোবেল প্রাপ্তির খবর ও জাতিসংঘ পুরস্কারের গুজব তিনি বের করেন। 

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ২০১৭ সালের অক্টোবরে ইংরেজি ভার্সনে তারেক রহমানকে বিশ্বের অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকায় ১৭তম বানানো হয়। বিবিসি বাংলা, এএফপি, বিডিফ্যাক্টচেক ও যাচাই.অর্গ এগুলো ভিত্তিহীন বলেছে। ফ্যাক্টচেকের পরও কার্ড ও ব্যানার ঘুরেছে বছরের পর বছর।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর নিউজ সাইটটি বন্ধ হয়, সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়। কিন্তু একই কোম্পানির ২০১৪ সালে খোলা ফেসবুক ও ইউটিউব পরে আবার সচল। পরিচয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা, কনটেন্ট ‘পর্যবেক্ষণ’। ২০২২ সালের একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ২৭ জুলাই ২০২৫ ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেয়, নঈম নিজাম ও প্রকাশক ময়নাল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে। ‍কিন্তু বোরহান কবির হাজির হননি। এর মধ্যেই তিনি ‘সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ তকমায় ফিরে এসেছেন।

নতুন মাধ্যমে পুরনো পদ্ধতি। আগে কাল্পনিক সংস্থার নামে র‍্যাঙ্কিং বানানো হতো, এখন সাক্ষাৎকারের ভেতরে বয়ান বানানো হচ্ছে। সেনাবাহিনীর ভেতরের ‘সমীকরণ’, দরবারের ‘চরম উত্তেজনা’, হাসিনা ফিরলে মিডিয়ার ‘ভূমিকা’—কোনো নথি, নামধারী সূত্র বা যাচাইযোগ্য ঘটনা ছাড়াই এগুলো বিশ্লেষণ হিসেবে পরিবেশিত হচ্ছে। দর্শক দেখছেন টকশো, শুনছেন রায়। পার্থক্য শুধু প্ল্যাটফর্মের। বাংলা ইনসাইডার ছিল গুজব কারখানার সাইনবোর্ড। এখন গুজব কারখানা বেনামে চলছে, পণ্য একই: একপক্ষের বীরত্ব, প্রতিপক্ষের সংকট, আর মাঝখানে এমন বাক্য যা শুনতে খবর, যাচাই করলে বয়ান।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ গুঞ্জন: জামায়াতের রাজনীতিতে প্রশ্নের পাহাড়

যে প্রশ্ন জনমনে- আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের ‘সমঝোতা’ গুঞ্জন!   

আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট বা সমঝোতার সম্ভাবনা নেই—জামায়াতে ইসলামীর এই বক্তব্য যতটা কঠোর, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোও ততটাই অস্বস্তিকর। জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু বক্তব্যই শেষ কথা নয়; দলটির প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের খবরও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিষয়ে জামায়াতের কঠোর ভাষার পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে দৃশ্যমান রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং নতুন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।

১ অক্টোবর ফেনীর ফুলগাজীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত’ রাজনৈতিক শক্তি আবার একসঙ্গে এসেছে। তিনি জনগণকে এ ধরনের রাজনীতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ; নিশ্চয় তিনি তথ্যসূত্র থেকেই কথাটি বলেছেন। এর আগেও কিছু কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে জামায়াতের নমনীয়তা দেখে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। কেননা জামায়াত এনসিপির কোনো সমাবেশে এমনকি লং মার্চেও আওয়ামী দুঃশাসনের কোনো চিত্র তারা জনসম্মুখে তুলে ধরেনি। 

জামায়াতের ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি ছিল, কিন্তু জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো উল্লেখ ছিল না। এ নিয়ে বিএনপি ও অন্য মহলে প্রশ্ন ওঠে। জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের ব্যাখ্যা ছিল, প্রদর্শনীটি মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনের ইতিহাস তুলে ধরেছে এবং জিয়াউর রহমানকে তারা কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা করেন না। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পরও রাজনৈতিক প্রশ্নটি পুরোপুরি শেষ হয়নি—কারণ ইতিহাসের কোন অংশ সামনে আনা হবে, কোন অংশ বাদ যাবে, সেটিও একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ২০২৬ সালে জুলাই অভ্যুত্থান, গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়েছে। দলটি এখন শুধু রাজপথের আন্দোলনকারী শক্তি নয়; জাতীয় সংসদেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের ১২ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন; পরবর্তী প্রক্রিয়ায় জোটের মোট বরাদ্দ ১৩-এ দাঁড়ায়। ফলে তাদের কাছে এখন রাজপথের আন্দোলন এবং সংসদীয় রাজনীতির—দুই ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার দায় আরও বেশি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘গোপন সমঝোতা হয়েছে কি না’—শুধু এটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, জামায়াত কি একই সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিসর, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত এবং জুলাই-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক আবেগ—তিনটিকেই নিজের রাজনৈতিক বিস্তারের জন্য ব্যবহার করছে? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়, স্বচ্ছ রাজনৈতিক আচরণ, প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড দিয়েই দিতে হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা নেই—জামায়াতের এই অবস্থান আপাতত প্রকাশ্য হলেও কর্মকাণ্ডে কিন্তু তা প্রকাশ পাচ্ছে না। জামায়াতের এই অবস্থানের সঙ্গে তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।

অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বর্তমানের জোটনীতি এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী কৌশল—কোনোটিই অস্পষ্টতার আড়ালে থাকলে ‘সমঝোতা’ নিয়ে গুঞ্জন থামানো কঠিন। তাই অস্বীকারের পাশাপাশি জামায়াতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—কথা ও কাজের মধ্যে দৃশ্যমান সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা।

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team